চলেই গেলেন কীর্তিমান পাইলট নওশাদ

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২১, ০০:৪৪

বারবার বিপদ কাটিয়ে ফিরে এসেছেন তিনি। পুরো দেশের মানুষ আশায় ছিল এবারও তিনি মৃত্যুকে জয় করবেন, ফিরে আসবেন। কিন্তু তা আর হলো না। অনেক মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণ বাঁচানো কীর্তিমান পাইলট নওশাদ চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। মাঝ আকাশে হার্ট অ্যাটাকের শিকার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দক্ষ ও সাহসী পাইলট ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম টানা ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ‘কোমায়’ থেকে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। গতকাল সোমবার স্থানীয় সময় ১০টা ৪৫ মিনিটে ভারতের নাগপুরের কিংসওয়ে হাসপাতালের চিকিত্সকরা তার লাইফসাপোর্ট খুলে ফেলেন। বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এতথ্য জানান। তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন নওশাদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।

শেষবার ১২৪ যাত্রীর প্রাণ রক্ষা করেছেন। এর আগে ২০১৬ সালেও ক্ষতিগ্রস্ত বিমান নিয়ে নিরাপদে অবতরণ করে ১৫৮ জনের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। নওশাদের সঙ্গে বিমানের যেন বন্ধুত্ব ছিল। বিপদের মুখে কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই বারবার নিরাপদে অবতরণ করতে পারতেন তিনি। মানুষের প্রাণ বাঁচানোকে অভ্যাসে পরিণত করলেও তার জীবনের শেষ রক্ষা হলো না।  পাইলট নওশাদ চলে গেছেন। তবে তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলার মানুষের হূদয়ে। বিমান বাংলাদেশের অহংকার হয়ে।

তার মৃত্যুতে দেশের মানুষের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ক্যাপ্টেন নওশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

নওশাদ ও তার ফার্স্ট অফিসারের বুদ্ধিমত্তায় জীবন রক্ষা পেয়েছিল ওমান থেকে ঢাকার উদ্দেশে আসা ১২৪ যাত্রীর। ক্যাপ্টেন নওশাদের দক্ষতা ও বীরত্বের কাহিনী এটিই প্রথম নয়। পাঁচ বছর আগেও নওশাদ তার বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগ করে আরো ১৪৯ যাত্রী, দুই পাইলট আর সাত ক্রুর জীবন বাঁচিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১২২ ফ্লাইটে ক্যাপ্টেনের দায়িত্বে ছিলেন নওশাদ। সেই ফ্লাইটটি মাস্কাট বিমানবন্দর থেকে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা করেছিল। টেক-অফ করার পর মাস্কাট বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ক্যাপ্টেন নওশাদকে জানানো হয়, রানওয়েতে টায়ারের কিছু অংশ পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত বিমান এয়ার ক্রাফটের হতে পারে। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নওশাদ বিমানটি চট্টগ্রামে অবতরণ না করে ঢাকা বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন। অবতরণের আগে ক্যাপ্টেন ফ্লাইটটি নিয়ে রানওয়ের ওপরে ‍দুইবার লো লেভেলে ফ্লাই করেন।  তখন দেখা যায়, উড়োজাহাজের পেছনের দুই নম্বর টায়ারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে ক্যাপ্টেন নওশাদ দক্ষতার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত টায়ার ও ল্যান্ডিং গিয়ারসহই নিরাপদে ফ্লাইটটি অবতরণ করাতে সক্ষম হন।

গত শুক্রবার মাসকাট-ঢাকা রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সিডিউল ফ্লাইট বিজি ০২২ মোট ১২৪ যাত্রী নিয়ে ঢাকা আসার পথে পাইলট ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম হঠাত্ হার্ট অ্যাটাক করেন। পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সিডিউল ফ্লাইটটির (বিজি ০২২) নিয়ন্ত্রণ নেন ফার্স্ট অফিসার মোস্তাকিম। তিনি ভারতের মহারাষ্ট্রের নাগপুরের ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইটটি জরুরি অবতরণ করান। এরপর নাগপুরের ঐ হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য তাকে ভর্তি করা হয়। কিংসওয়ে হাসপাতালের মেডিক্যাল সার্ভিসের পরিচালক সুভরজিত্ দাশগুপ্ত, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ফিজিশিয়ান রঞ্জন বারোকার এবং বীরেন্দ্র বেলেকারের অধীনে চিকিত্সাধীন থাকেন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় তিনি ‘কোমায়’ চলে যান। গত রবিবার থেকে ক্যাপ্টেন নওশাদ ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ হলেও স্বজনরা লাইফসাপোর্ট খুলে দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। আরো পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর লাইফসাপোর্ট খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন তারা। এরপর গতকাল সোমবার তার লাইফসাপোর্ট খুলে দিয়ে নওশাদকে মৃত ঘোষণা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বিমান বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রায় তিন দিন ধরে চেষ্টা চালিয়েও ফেরানো যায়নি কৃতী এ পাইলটকে। হাসপাতালে তার দুই বোনও রয়েছেন, তাদের সঙ্গে বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজারও রয়েছেন।

ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম ১৯৭৭ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে পাইলট হিসেবে যোগদান করেন। বাবা আব্দুল কাইয়ুমও একসময় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন ছিলেন। তিনি ডিসি-১০ উড়োজাহাজের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় ‘কোরিয়ান এয়ার’ এবং ‘সৌদি এয়ারলাইনসেও’ দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র এই পাইলট। চলতি বছরেই আব্দুল কাইয়ুম মারা যান। পেশাগত জীবনে বাবা-ছেলের যেমন মিল রয়েছে, তেমনি চলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আরেকটা মিল রেখে গেলেন তারা। দুই জনেরই মৃত্যু হলো ভারতে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে আব্দুল কাইয়ুম মারা যান ভারতের কলকাতায়।