আফগান যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে বাইডেনের ভাষণ

যুদ্ধ চিরকাল চলতে পারে না

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৭

আফগান যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন,  যুদ্ধ যেমন চিরকাল চলতে পারে না, তেমন যুদ্ধ শেষের প্রক্রিয়াও চিরকাল চলতে পারে না। সবকিছুরই একটা শেষ আছে। তিনি জানান, যুদ্ধ শেষ হলেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। তিনি যুদ্ধ নিয়ে পররাষ্ট্র নীতিতেও পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট বাইডেন এই ভাষণ দেন। আফগান যুদ্ধ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই।

যুদ্ধের খরচ

প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানিয়েছেন, আফগানিস্তানে যুদ্ধের জন্য প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হয় আমেরিকার। ২০ বছর ধরে এই বিপুল খরচ হয়েছে। তার কথায়, ৮ লাখ মার্কিন আফগান যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। প্রায় আড়াই হাজার সেনা মারা গেছেন। যার মধ্যে ১৩ জন সেনার মৃত্যু হয়েছে বিমানবন্দরের শেষ বিস্ফোরণে। আমেরিকা তাদের ভুলবে না। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, বিপুল খরচ করে দীর্ঘদিন ধরে তিন লাখেরও বেশি আফগান সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও প্রয়োজনের সময় তারা ময়দানে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে পারল না।

সমালোচনার জবাব

আন্তর্জাতিক বিশ্বে তো বটেই দেশের ভেতরেও বাইডেনের বিরোধীরা তার সমালোচনায় সোচ্চার। যে কায়দায় প্রেসিডেন্ট আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়েছেন, যেভাবে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তালেবান আফগানিস্তানের দখল নিয়েছে এবং যেভাবে উদ্ধারকাজ হয়েছে, তার সবকিছুরই সমালোচনা হচ্ছে। বাইডেনের জবাব, চিরকাল ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ শেষও করা যায় না। একসময় চরম সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। তিনি সেই সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।

উদ্ধারকাজের প্রশংসা

প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানিয়েছেন, মার্কিন সেনা যেভাবে উদ্ধারকাজ চালিয়েছে, তা ঐতিহাসিক। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। যার মধ্যে ৯০ শতাংশ দেশে ফিরতে চাওয়া আমেরিকান আছেন। যাদের আনা যায়নি, তাদেরও কিছুদিনের মধ্যে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন বাইডেন। তালেবান কাবুল বিমানবন্দর খুললেই সেই প্রক্রিয়া শুরু হবে। বাইডেন জানিয়েছেন, এর চেয়ে ভালোভাবে উদ্ধারকাজ সম্ভব ছিল না। বহু প্রতিকূলতার মধ্যে উদ্ধারকাজ চালিয়েছে সেনা।

পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের ভাবনা

বাইডেন বক্তৃতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছেন। এরপর আমেরিকা কোনো দেশে কোনো মিশনে গেলে স্পষ্ট ভাবনা নিয়ে যাবে। অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে, এমন মিশন আমেরিকা নেবে না। বাইডেনের কথায় স্পষ্ট, তিনি আফগানিস্তানে যেভাবে ২০ বছর ধরে মার্কিন সেনা থেকেছে, তার সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, আফগানিস্তানে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন সেনা গিয়েছিল। সেই কাজ হয়ে যাওয়ার পরেও প্রায় এক দশক মার্কিন সেনা সেখানে থেকে গিয়েছিল। এই বিষয়টিই মেনে নিতে পারছেন না প্রেসিডেন্ট। আগামী দিনে এমন পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকা নেবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাইডেন।

ট্রাম্প আমলেই সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত

কাতারের রাজধানী দোহায় ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জালমে খলিলজাদ এবং তালেবানের দোহা মুখপাত্র সুহাইল শাহীনের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ছিলেন আফগান-আমেরিকান কূটনীতিক জালমে খলিলজাদ। তিনি ইরাক যুদ্ধের সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই তার দক্ষতার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় তাকেই নিয়োগ দেয়। কাতারে ৯ দফা আলাপ-আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান একটি চুক্তিতে সম্মত হয় বলে মনে করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২১ সালের মে মাসের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ সব বিদেশি সেনা প্রত্যহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছরের অক্টোবরেই এক টুইটার বার্তায় জানান, ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের আগেই আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনার চলে আসা উচিত। এর আগে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ ব্রায়েন বলেছিলেন, আগামী বছরের (২০২১ সাল) শুরুর দিকে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার পরিমাণ কমিয়ে আড়াই হাজারে নিয়ে আসা হবে। কিন্তু সেনা প্রত্যাহারের সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাঁধে চাপে।