যে উদাহরণ আমাদের অনুপ্রাণিত করে

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:০৭

লকডাউন চলাকালে পরিচয়পত্র দেখানো নিয়ে এক জন চিকিত্সক ও এক জন পুলিশ কর্মকর্তা, এক জন ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ঝগড়ার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। নিশ্চয়ই ঐ দিনের অমন দৃশ্যের কথা আমার মতো অনেকেরই মনে আছে। সামাজিক মাধ্যমে সমাজের এগিয়ে থাকা চিকিত্সক, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের কথোপকথনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছিল পুরো ঘটনার চিত্র। পুলিশের সংগঠন বিবৃতি দেয়, পালটা বিবৃতি দেয় চিকিত্সকদের সংগঠন। এ ঘটনায় হাইকোর্টের মন্তব্য ছিল, ‘ঐ ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিবৃতি, পালটা বিবৃতি দেওয়া অনভিপ্রেত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে সবাই দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।’ আমার কাছে মনে হয়েছে একমাত্র ‘বিনয়’ না থাকার কারণেই এমন অনভিপ্রেত ঘটনা। আসলে ‘দম্ভ’ দিয়ে যে সমাজকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, সেটা বোঝাতেই সাম্প্রতিক সময়ের একটি উদাহরণ টেনে আনলাম মাত্র। অথচ আমরা ভুলে যাই সমাজ তাদেরই উচ্চমর্যাদায় বরণ করে নেয়, যাদের মধ্যে বিনয় আছে। যিনি বিবেচক নন, কৃতজ্ঞাতাবোধের লেশমাত্র নেই, মোটেই সংযত নন, তিনি আর যাই হোক, সমাজে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেন না।  

২০০৯ সালের ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যে। শুধু দেখাই নয়, হয়েছিল কুশল বিনিময় ও ভাব আদান-প্রদানও। দুই নেত্রীর ঐ ছবি টেলিভিশন আর পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হলে পুরো দেশবাসীর মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতির জন্ম হয়। উভয়ের মধ্যে বিনয় ছাড়া এমন পরিবেশ কি কখনো তৈরি সম্ভব? অথবা এভাবে বলা যেতে পারে, কোনো এক জনের মধ্যে যদি বিনয়ের সামান্যতম অভাব থাকে, তাহলেও বর্তমান ও সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীর হাসিমাখা মুখ একই ফ্রেমে বন্দি করা সম্ভব নয়। এরপর ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর দুজনের মধ্যে সর্বশেষ কথা হয়েছিল। প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোন করে খালেদা জিয়াকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন খালেদা জিয়া। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয় শুধু বিনয়ের কারণে। একজন প্রধানমন্ত্রী বিনয়ী হলেই নিজে থেকে ফোন করে সংলাপে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। আবার ঐ প্রান্তে যিনি আছেন তিনিও সাবেক প্রধানমন্ত্রী। বিনয়ের অভাব কিংবা নিজেকে অন্যের থেকে শ্রেষ্ঠ—এমন মনোভাব থাকলে টেলিফোন আলাপই তো সম্ভব হতো না।

সমাজকে এগিয়ে নিতে বিনয়ের হাজারো উদাহরণ আছে এই সমাজে। কিন্তু আমরা শুধুই দাম্ভিকতা, বাহাদুরি, নিজেকে অন্যের থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা, অহংকার করা—এসব নিয়েই মেতে থাকি। ইদানীং এমন সব ঘটনাই ভাইরাল হয়। মূলধারার অনলাইন বা পাড়ার ছোকরার ফেইসবুক পাতা—সবখানেই ভাইরাল হয় ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আর হট্টগোলের খবর। অথচ এর বাইরেও আছে কত ঘটনা, কত খবর।

২০১৩ সালের ২৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেছিলেন মিরপুর-এয়ারপোর্ট ফ্লাইওভার। গলফ ক্লাব মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তৃতার যে তালিকা ছিল, তাতে যোগোযোগমন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর আগে বক্তৃতা দেওয়ার কথা ওবায়দুল কাদেরের। তালিকাটা সেভাবেই করা ছিল। ঘোষণাও হয়েছিল তাই। ওবায়দুল কাদেরের আগে যখন মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হলো, ‘এখন বক্তব্য দেবেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ’, তখন ওবায়দুল কাদের নিজের আসন থেকে উঠে মাইক্রোফোনের সামনে এসে বলেন, ‘এরশাদ সাহেব বয়সে বড়, আমার বড় ভাই। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি। আমার পরেই তিনি বক্তৃতা দেবেন।’ এমন ঘটনা ভাইরাল হয়নি। কোনো গণমাধ্যম বিনয়ের এমন সংবাদ প্রচার করেনি, প্রকাশ করেনি।

গত ১৪ আগস্ট শোক দিবসের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে চ্যানেল আই অনলাইন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। অতিথি হিসেবে ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ, শিক্ষাসচিব মাহবুব হোসেন, জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কার্ডে কার নাম আগে যাবে? পরামর্শ নেওয়া হলো সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইনের। তিনি বল্লেন, ‘দেখুন, সবকিছু ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স দিয়ে হয় না। এটি প্রোটোকল তালিকা মাত্র। এর বাইরে আছে সামাজিক আচার, সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা।’ উদাহরণ দিয়ে সোহরাব হোসেন বলেন, ‘লাল গালিচা প্রধানমন্ত্রীর জন্য। কিন্তু যখন প্রধামন্ত্রীর শিক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান থাকেন, তখন প্রধামন্ত্রী বিনয়ী হন, লাল কার্পেটে থাকেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। এখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পদসমূহের ক্রমবিন্যাস মানা সম্ভব হয় না। শিক্ষাসচিব মাহবুব হোসেন জানালেন, তিনি সচিব হলেও শিক্ষাবিদ হিসেবে রফিকুল ইসলাম স্যারের নাম কোনোভাবেই যেন তার পরে না যায়। অবশ্যই তার নামের পরে বসবে সচিবের নাম।’ অনুষ্ঠানটি যখন সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল, তখন প্রধান অতিথি হিসেবে শেষ বক্তা শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিরই থাকার কথা। কিন্তু তিনি বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, তোফায়েল আহমেদের আগেই তিনি বক্তব্য রাখতে চান। এখানেই শেষ নয়। মহরমের রোজা রেখেছিলেন ডা. দীপু মনি। কিন্তু আবারো বিনয়। আয়োজক কাউকে জানালেনই না তিনি রোজা। ফলে অনুষ্ঠান যখন মাগরিবের আজানের অনেক পরে শেষ হলো, তাঁকে ইফতারও করতে হলো প্রায় ৪৫ মিনিট পর। অর্থাত্ সর্বোচ্চ বিনয় পারে এমন ঘটনার জন্ম দিতে।

একটি তথ্যের জন্য মাসখানেক আগে ফোন দিয়েছিলাম সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক, সরকারের যুগ্মসচিব মমতাজ উদ্দিনকে। ফোন ধরে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে জানালেন তার সন্তানের করোনা পজিটিভ। চিকিত্সা চলছে। অবাক হলাম, এমন মুমূর্ষু অবস্থায় একজন গণমাধ্যমকর্মীর ফোন ধরেন একজন আমলা! ঘটনা এখানেই শেষ নয়, আরেকটি তথ্য জানতে মোবাইলে মেসেজ পাঠাই তাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্যটি দেন তিনি। একই সঙ্গে জানান, তার বড় ভাই ইন্তেকাল করেছেন, তিনি গ্রামের বাড়িতে আছেন। আমি লজ্জিত হয়ে বার্তা দিলাম, সরি! তিনি পালটা জনালেন, এটাই তার দায়িত্ব।

বিনয়ের এমন হাজারো সংবাদ আছে, যেগুলো শুনলে মন ভালো হয়ে যায়। আমার কাছে মনে হয় এমন সংবাদই আসলে ছড়িয়ে পড়া উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সমাজ থেকে বিনয় যেন দিনদিন উড়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই মাটি দখল করছি, কিন্তু মাথার ওপরের বিশাল আকাশ কেউ দেখছি না। করোনার এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা কেউ বিনয়ী হচ্ছি না। সমাজের উঁচু স্তর থেকে সাধারণ মানুষ—সবার মধ্যেই যেন বিনয়ের অভাব। টেলিভিশনের পর্দায় একই কথা বারবার শোনান দায়িত্বশীল মানুষ। গণমাধ্যমও তা প্রচার করে। ইউটিউবে একটা জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদের দর্শক যদি হয় কয়েক মিলিয়ন, সব সময় ঘ্যানঘ্যান করা উঁচু মানুষের বক্তব্যের ভিউ এক হাজারও পার হয় না। কি আসে-যায় গণমাধ্যমের? এগুলো ভাবার সময় কি তাদের আছে?

প্রত্যেক মানুষ যদি মানবিক না হই, পরিবার থেকে যদি এমন শিক্ষা না পাওয়া যায়, তাহলে এমন সমাজব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি আশা করা যায় না। নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে চাই, বিনয়ী মানুষ কখনো পিছিয়ে থাকে না। বিনয়ী জাতির দেশ সব সময় এগিয়ে থাকে। পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল চলা শুরু হয়েছে, মাওয়ার রাস্তায় উন্নত দেশের পরিবেশ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ব্ল্যাকবোর্ডের পরিবর্তে যুক্ত হয়েছে হোয়াইট বোর্ড, বিনিয়োগ বেড়েছে, বেড়েছে রিজার্ভ, কিন্তু বিনয়ী না হলে এমন অর্জন ধরে রাখা কষ্টকর হবে। ঢাকার রাস্তায় লাল লাইট জ্বলবে আর সব গাড়ি থেমে যাবে—এটাও তো উন্নয়ন। দেশের প্রতিটি থানায় মামলা আর জিডির বিশাল তালিকা। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়, বাংলাদেশের কোন প্রান্তের থানায় মাসের পর মাস মামলা হয় না? আচ্ছা, থানায় মামলা না হওয়াটাও তো উন্নয়ন। বিশ্বের অনেক দেশেও তো এর উদাহরণ আছে। তাই বিনয়ী হওয়ার দিকে এখন নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে ‘বিনয়ী’ হওয়ার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। হাস্যকর মনে হলেও করা প্রয়োজন। কারণ আমার কাছে মনে হয়, এই সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে একমাত্র বিনয়। কারণ যে দেশে, যে সমাজে যেটার অভাব, বিনিয়োগ তো সেখানেই প্রয়োজন।

n লেখক :বিশেষ প্রতিনিধি, চ্যানেল আই।

সভাপতি, বাংলাদেশ এডুকেশন রিপোর্টার্স ফোরাম।