চার জেলায় বন্যার অবনতি

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৩৫

জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ঐসব এলাকায় অধিকাংশ নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি এবং সেই সঙ্গে গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জামালপুরে ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিপত্সীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ ও পানি পরিমাপক আব্দুল মান্নান। এদিকে জেলার সাতটি উপজেলার কমপক্ষে ৩৫টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী জানান, সাতটি উপজেলায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ পর্যন্ত ৬৫টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. সাখাওয়াত্ ইকরাম জানান, বন্যার পানিতে জেলার ৩ হাজার ৬২৩ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে রোপা আমন ধান ৩ হাজার ৫৩০ হেক্টর, রোপা আমন বীজতলা ৪৫ হেক্টর এবং শাকসবজি ৪৮ হেক্টর।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বেড়ে গতকাল বিপত্সীমার ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন।

জানা গেছে, পানি বাড়ার ফলে প্রতিদিনই নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পানি বৃদ্ধি ও ভাঙন অব্যাহত থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছেন নদী পাড়ের মানুষ, বিপাকে পড়েছেন গরুর খামারিরা। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানান, সিরাজগঞ্জ ও শাহজাদপুরে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে নগদ অর্থ ও চাল বিতরণ করা হয়েছে।                   কাজীপুরে মেঘাই ঘাটে পানি ২৪ ঘণ্টায় ছয় সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে বিপত্সীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে জানান পানি পরিমাপক ওমর আলী। অপরদিকে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টের পানি পরিমাপক আব্দুল লতিফ জানান, ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সিরাজগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তের উপপরিচালক মো. আবু হানিফ জানান, এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৬২ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধা জেলার সবগুলো নদনদীর পানি বেড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ফুলছড়ি উপজেলার বালাসী পয়েন্টে ৫০ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘটের পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ এলাকায় বিপত্সীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তিস্তা ও করতোয়ার পানি বিপত্সীমা ছুঁই ছুঁই করছে।

জেলার চার উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দেড় হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ও শাকসবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবন্দিদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ এখনো শুরু হয়নি। তবে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন মো. আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত চার উপজেলাবাসীর জন্য ২ লাখ টাকা ও ৮০ মেট্রিক চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। শিগিগরই এগুলো বিতরণ করা হবে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, পানি বাড়লেও চলতি বছর বড় বন্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই। কয়েক দিনের মধ্যই পানি কমা শুরু হবে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সদর উপজেলা ছাড়াও চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত ৭০ হাজার মানুষ। বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির রোপা আমন, ২৮৫ হেক্টর জমির সবজিখেত ও ১১৫ হেক্টর জমির বীজতলা। গতকাল বিকাল ৩টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে চিলমারী পয়েন্টে বিপত্সীমার ৫১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ধরলার পানি কিছুটা কমে সেতু পয়েন্টে বিপত্সীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বন্যার্তদের জন্য ২৮০ টন চাল ও সাড়ে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম।

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের চিলমারীতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার ফকিরেরহাট, কয়ারপার, বুরুজের মাঝিপাড়া, পেদিখাওয়া, মজাইডাঙ্গা, হারিয়েরছড়া, নাউয়েরডাবরি, মাইলডাঙ্গা এলাকা প্লাবিত হয়ে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কয়েক হাজার হেক্টর জমির রোপা আমনখেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে আশ্রিত মানুষের মাঝে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যায় দুই শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কুমার প্রণয় বিশান দাস জানান, বন্যায় ৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ও ৩০ হেক্টর জমির শাকসবজি খেত তলিয়ে গেছে।

সারিয়াকান্দিতে হুমকির মুখে বাঁধ, বন্যাকবলিত হতে পারে সাত গ্রাম

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, যমুনায় পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকায় রৌহাদহ ক্রসবাঁধ ও নির্মাণাধীন রিংবাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। এতে সাতটি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। রিংবাঁধ ভেঙে নদীর পানি জনপদে প্রবেশ করলে রৌহাদহ, ফকিরপাড়া, কামালপুর, ঘুঘুমারি, ইছামারা, হাওড়াখালী ও গোদাখালী গ্রামের ৩ হাজার বিঘা জমির রোপা আমনসহ অন্যান্য ফসল, বীজতলা বন্যার পানিতে তলিয়ে যাবে। একই সঙ্গে গ্রামের ৪ হাজার বাড়িঘর, ১১টি মসজিদ, তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কমিউনিটি সেন্টার ও দুটি মাজার পানিতে নিমজ্জিত হবে। গতকাল মধ্যরাতে রৌহাদহ কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে মাইকিং করে গ্রামবাসীদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়। গতকাল যমুনায় পানি বিপত্সীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ঐ রিংবাঁধ নির্মাণে আমরা টেকনিক্যাল সহায়তা দিচ্ছি। মানুষের উপকার হলে বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে এখানে বাঁধ নির্মাণের চিন্তাভাবনা রয়েছে।