মখমল কাপড়ে তৈরি পুতুলকে আয়তু ঘুম পাড়াতে পারে। মা যখন আয়তুকে মশারির ভেতরে ঢুকিয়ে বলে, ‘আয়তু মণি আতো, এখন ঘুম দেব।’
আয়তু তখন মন খারাপ করে বিছানায় আসে। না, ঘুমায় না বলে আয়তু তার পুতুলকে ডাকে, ‘বানি আতো, আতো।’
মা বানিকে বিছানায় আয়তুর পাশে শুতে দেয়। আয়তু বানিকে তার বালিশের পাশে শুইয়ে বানিকে ঘুম পাড়ায়। বলে, ‘বানি আতো, ঘুমাও ঘুমাও।’
মায়ের মতো সুর করে গান ধরে, ‘আমার থোত্ত বালিশ রে ভাই তুই, তোল ওপল মাতা রেকে রোদ আমি ঘুমোই।’
আয়তুর বানি অনেক দুষ্টু। বানি, ওর বড় দুটো হাত দিয়ে আয়তুকে জড়িয়ে ধরে। ঠ্যাং দুটো পেটের ওপর তুলে উলটো হয়ে আয়তুকে কোলবালিশ বানায়। বলে, ‘আমি ঘুমাই না, ঘুমাই না।’
আয়তু বকা দেয়, ‘ঘুমাও দুত্তু মেয়ে, না হলে বকা দেব তোমাকে। আর তককেট দেব না। ললিপ দেব না।’
আয়তুর এই কাণ্ড দেখে আয়তুর মা ভিতরে ভিতরে হাসতে হাসতে শেষ। আয়তুর সঙ্গে ওর মা যা যা করে, আয়তু তাই করছে বানির সঙ্গে। বানিকে আবার ওপাশ করে গালে একটা আলতো থাপ্পড় দিয়ে বলল, ‘পচা মেয়ে, ঘুমাও মাববো তোমাকে!’
আয়তু আবার বানিকে নিয়ে বিছানায় উঠে বসে। একটু দূরে নাননার গলার আওয়াজ টের পেতেই খোলা দরোজা দিয়ে এক দৌড়ে বাইরের ঘরে চলে আসে। সঙ্গে তার বানি। নানাও চান না আয়তু ঘুমাক। নাননার কোলে উঠে আয়তু গলা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘নাননা তলো বাইয়ে, বাইয়ে যাই।’
‘এত রাতে বাইয়ে? পাগল ধববে নানা ভাই!’
আয়তু পাগলকে ভয় পায় না। বলে, ‘ভয় পায় না...তলো যাই। বাইয়ে বাইয়ে...রিসসা যাব।’
নাননা আয়তুকে কোলে নিয়ে বাইরের ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ কোলে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন। খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো গান গাইতে গাইতে দুই তিন চক্কর দিতেই ঘাড়ে আয়তু তার মাথা ফেলে দিল। আয়তুর বানি হাত থেকে পড়ে গেল ধুপুস করে। নাননার গলাটা আয়তু ততক্ষণে দুহাতে পেঁচিয়ে ধরেছে। চোখ ধরে এসেছে। আয়তু ঘুমিয়ে পড়ল নাননার ঘাড়ে মাথাটা কাত করে।
আয়তুর মা বলল, ‘আব্বা তুমি আসছ দুদিনের জন্য। আমার মেয়েটাকে মায়া লাগিয়ে দিয়ে তো চলেই যাবা!’
সবার আগে আয়তু ঘুম থেকে উঠে চুপচাপ বাবা-মায়ের মাঝখানে বসে থাকে। তারপর আবার বাবার বুকের ওপর উঠে বসে দুহাত, দুপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে। বাবার বুকে ছোট্ট আয়তু ঘুমায় যেমন পাখির ডানায় লুকিয়ে ঘুমায় পাখির বাচ্চাগুলো।
বাবার আগে আয়তুর মায়ের ঘুম ভাঙে। আয়তুর মা জানে তখন আয়তুর দাঁত ব্রাশের সময়। বাড়ির সবাই যখন ঘুমে তখন সারা ঘরে আয়তু আর আয়তুর মা পায়চারি করে। শেল্ফ থেকে মধু মাখানো পপকর্ন আয়তু বের করতে পারে। একটা সে খায়, আরেকটা বানিকে মুখে দিয়ে বলে, ‘কাও... কাও!’
আয়তুর মা সকালবেলার কাজ গোছানোর জন্য আয়তুকে একা মাদুর পেতে দেয়। অনেকগুলো খেলনা দিয়ে মা বলে, ‘আয়তু খেলো। এই যে গাড়ি, রেড কালার, এই যে গ্রিন কালার ইয়ো ইয়ো, এই দেখো জাহাজ, অ্যারোপ্লেন, স্কুল বাস, ইয়া...রকেট।’
মাদুর পেতে রাজ্যের খেলনা নিয়ে আয়তু আর ওর পুতুল বানি, দুজনে খেলে। ঘরের সবাই আস্তে আস্তে ঘুম থেকে ওঠে। বাবা এসে আয়তুর সঙ্গে একটু ভাব জমাতে আসে।
আয়তু বলে, ‘আতে না, আতে না...আমি বানি কেলি।’
আয়তুর দিকে তাকিয়ে বাবা হাসে। বলে, ‘আচ্ছা আচ্ছা তুমি খেলো, আমি আববো না।’
আয়তুর খেলার ঘরের মাদুরে আলো যখন হেলতে দুলতে গায়ে লাগে ততক্ষণে বাড়ির সবাই নাস্তার টেবিলে। আয়তু নাস্তার টেবিলে একা বসবে না। বসবে মায়ের কোলে। মা আর আয়তু মিলে নাস্তা খায়। রুটির একটা টুকরো মা আলুভাজি লাগিয়ে আয়তুকে দেয়। আয়তু মুখে দিয়ে চিবোয় আস্তে আস্তে। আরেক টুকরো রুটি মা দিতেই আয়তু মায়ের মুখের দিকে মুখ করে ছোট্ট হাতে তুলে দেয়, ‘তুমি কাও, তুমি কাও?’
আয়তুর মায়ের চোখ দেয়াল ঘড়ির দিকে যায়। নিচে অফিসের গাড়ি এসে গেছে। এবার আয়তুর বাবার কাজ শুরু। আয়তুকে কোলে নেয়ার জন্য নানা বাহানা। আয়তু মায়ের কোল ছাড়বে না। বাবা বলল, ‘আয়তু রিসসা যাবে?’
আয়তু বলে, ‘না যাবে না। মা যাবে।’
আয়তুর মা ওদের রুমের ড্রেসিং টেবিলে দাঁড়িয়ে অফিস যাওয়ার শেষ প্রস্তুতি সারে। আয়তু বাবার কোলে কাঁদছে। বাবা জোর করে গেস্ট রুমের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আয়তুকে গাছ দেখায়। রাস্তার ওপর দিয়ে রিকশা যাওয়া দেখায়।
‘আয়তু ওই দেখো, একটা ডগ, ডগ যাচ্ছে।’ আয়তুর বাবার মনটাও নরম হয়ে আসে। ভাঙা স্বরে আয়তুকে বলে, ‘মারে, এখন তো আমার হোম অফিস। সবকিছু ঠিকঠাক হলে কী করবি!’
আয়তুর মায়ের লাল গাড়ি গলির শেষ মাথায় এসে ডানে মোড় নেয়। আয়তুর মা ডাকে, ‘এই মা।’ আয়তুর মায়ের চোখ ভেজে। লাল গাড়ির ড্রাইভার তা বোঝে না।
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
