ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বিনিয়োগ চাহিদা নেই

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:৫৯

 

করোনায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ করার জায়গা নেই বলেই চলে। এর সঙ্গে সরকারঘোষিত প্রণোদনার টাকা যুক্ত হয়েছে ব্যাংকে। প্রণোদনার টাকা ব্যবসায়ীরা সঠিকভাবে ও সঠিক সময়ে কাজে লাগাতে পারছেন না। গত বছর থেকে এ পর্যন্ত উত্সবভিত্তিক অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে মার খেয়েছে। ফলে টাকা ঘুরছে না, পুনরায় চলে যাচ্ছে ব্যাংকে। ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ যে তলানিতে চলে গেছে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেই বুঝা যায়। চলতি বছরের ৩১ মার্চ (বার্ষিক ভিত্তিতে) পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানতের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। মার্চ পর্যন্ত আমানতে সবচেয়ে বেশি ২২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। যদিও আমানতের এ উচ্চপ্রবৃদ্ধির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত মার্চ পর্যন্ত দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে এ ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ১ শতাংশের বেশি হয়নি।

আমানতে উচ্চপ্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোও। যদিও এসব ব্যাংকের ঋণে প্রবৃদ্ধির বদলে উলটো সংকোচন হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত এক বছরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে এ শ্রেণির ব্যাংকগুলোর ঋণ সংকুচিত হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকারি খাতের বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ১১ দশমিক ৫ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধির এ অসামঞ্জস্যতাই দেশের ব্যাংক খাতে অলস তারল্যের স্তূপ তৈরিতে সহায়তা করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, জুন শেষে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ঋণ আমানতের অনুপাত জুন শেষে নেমে এসেছে ৭২ শতাংশ। যেখানে সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে ৮৭ শতাংশ। ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত অর্থ বেড়ে গেছে। জুন শেষে শুধু এসএলআর সংরক্ষণ করার পরেও ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃৃৃত্ত অর্থ রয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আর বিধিবদ্ধ নগদ জমার হার অর্থাত্ সিআরআর অতিরিক্ত রয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে গত জুন শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে একেবারে অলস পড়ে ছিল প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এ অলস তারল্যের নেতিবাচক নানা প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতিতে। ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমেছে বেসরকারি ব্যাংকের মেয়াদি আমানতের সুদহার।

ব্যাংকগুলোর হাতে একদিকে উদ্বৃত্ত তহবিল বাড়তে থাকে, অপরদিকে বিনিয়োগ চাহিদা কমতে থাকে। সব মিলে আবারও তহবিল ব্যবস্থাপনায় চাপে পড়তে হচ্ছে। এ চাপ সামাল দেওয়ার জন্য আমানতের সুদহার কমাতে থাকে। এক পর্যায়ে গড় সুদহার ৪ শতাংশে নেমে আসে। ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় অনেক খানিই সমন্বয় হয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আমানতের সুদহার নির্ধারণ করে দেয়। এখন থেকে ব্যাংকের তিন মাস ও তার বেশি মেয়াদি আমানতের সুদহার কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হবে না। গত জুন মাসে ভোক্তা মূল্যসূচকের হিসেবে গড় মূল্যস্ফীতির ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সে হিসেবে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংককে মেয়াদি আমানতের সুদহার বাড়িয়ে সাড়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। আমানতের সুদের সঙ্গে ব্যাংকের অপারেশনাল খরচ যোগ করলে এ হার দাঁড়াবে সাড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশের মতো।

ব্যাংকগুলোর আয়ের অন্যতম উত্স হচ্ছে ঋণের বিপরীতে সুদ। ব্যাংকগুলো বর্তমানে বিনিয়োগ করছে ৭ থেকে ৯ শতাংশ হারে। সেখানে সাড়ে ৫ শতাংশ হারে আমানতের সুদ দিলে মুনাফা তো দূরের কথা মূলধনেও টান পড়ার আশঙ্কা আছে। ফলে ব্যাংকারদের কপালে ইতোমধ্যেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। কোনো কারণে মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে গেলে আমানতের সুদ হারও বাড়বে যা ব্যাংকগুলোকে আরো বিপজ্জনক অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।

এ অবস্থায় আমানতের সুদ হার নির্ধারণ করে দেওয়া ব্যাংকারদের মারাত্মক চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে। ব্যাংকারদের মতে, এমনিতেই ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ার ফলে আমানতের সুদহার কমিয়ে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় সমন্বয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির ওপরে আমানতের সুদহার বেঁধে দিতে হলে কমপক্ষে সাড়ে ৫ শতাংশের ওপরে নির্ধারণ করতে হবে। একদিকে অলস অর্থ, অপরদিকে খেলাপি ঋণের আধিক্য, সঙ্গে ঋণের কম সুদহার সব মিলেই ব্যাংকগুলোকে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় সমন্বয় করতে হিমশিম খেতে হবে এবং অনেক ব্যাংক মুনাফা করতে পারবে না যা মূলধনের ওপর চাপ পড়বে।

আমানতের অতিরিক্ত সুদ প্রদানের মাধ্যমে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় আরো বাড়লে আয় সমন্বয়ের জন্য ব্যাংকগুলো বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে যেমন মেয়াদি আমানত গ্রহণে নিরুত্সাহিত হতে পারে অন্যদিকে ঋণ ও অন্যান্য সেবার বিপরীতে সার্ভিস চার্জ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে অন্যান্য পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে যা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থায় আমানতের সুদহার বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।