নির্দিষ্ট সময়ে একটা দেশের অর্থনৈতিক অর্জন কতটা, সেটি বোঝার জন্য এখন পর্যন্ত জিডিপি হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ পরিমাপ। বলতে গেলে উন্নয়ন অনুধাবনের খসড়া ও নগদ প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই জিডিপি। বর্তমানে একটা দেশের অর্থনৈতিক নৈপুণ্যের পাশাপাশি কল্যাণ বিবেচনার জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হচ্ছে এই জিডিপি। জিডিপি স্বদেশে উত্পাদিত পণ্য ও পরিষেবার চূড়ান্ত মূল্য নিরূপণ করে এবং সেই মূল্যই দেশটির সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বর্ধিষ্ণু জিডিপি কোনো একটা অর্থনৈতিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিস্থিতিকে ধারণ করে না। পাশাপাশি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য উপলব্ধির জন্য পরিমাপক হিসেবে গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট (মোট দেশজ উত্পাদন) বা জিডিপি ব্যবহূত হয়ে আসছে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্বের নামিদামি অর্থনীতিবিদদের বেশ বড় একটা অংশই অর্থনীতির প্রকৃত হালহকিকত বোঝার জন্য শুধু জিডিপির ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না এবং হামেশাই এর পাশাপাশি অন্যান্য সূচকের আশ্রয় নিচ্ছেন, যেগুলো কার্যতই পরিবেশগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপটসমূহকেও হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করছে।
অতিমাত্রায় জিডিপির প্রতি লক্ষ রাখাটা খুব বড় মাত্রার ভুল হিসেবে পর্যবসিত হতে পারে এবং দেশের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে। এ বিষয়ে ভাসুকি শাস্ত্রী তার শিহরন-জাগানো ‘হ্যাজ এশিয়া লস্ট ইট’ বইয়ে বেশ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এতে এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘আপনি যদি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জিডিপির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, তাহলে এশিয়ার অর্থনৈতিক ভবিষ্যেক মনে হবে দারুণ আশাব্যঞ্জক, যেটি কিনা ত্বরিত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি অবশ্য অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে গত কিছু বছরে তা হ্রাস পেলেও এ বিষয়ক গল্পের শিরোনামটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবে এরকম যে, এটি ‘এশীয় শতাব্দী’ কিংবা ‘পূর্ব এশীয় অর্থনৈতিক চমক’। কোটি কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং এই কৃতিত্ব এখন পর্যন্ত বিদ্যমান।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাবেক মুখপাত্র এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গণবিষয়াবলি-সম্পর্কিত বিশ্বপ্রধান যে তত্ত্বকে সামনে নিয়ে এসেছেন, সেটি হচ্ছে কয়েক দশকের দৃঢ় প্রবৃদ্ধি এত বেশি সমস্যাকে আড়াল করেছে যে, কিছু দেশ অপরিসীম ‘মধ্য-আয়ের ফাঁদে’ আটকা পড়তে পারে। কেউ কেউ সব ধরনের সমস্যাকে ভবিষ্যতের জন্য এমনভাবে জমিয়ে রাখছে যে, এখনই সতর্কঘণ্টা বাজানোর পাশাপাশি হন্যে হয়ে সুরাহার উপায় খোঁজা প্রয়োজন। তার কথায়, ‘এশিয়ার এ অংশের দিকে যখন তাকাই, অদূর ভবিষ্যতের দুরবস্থা টের পেয়েও সাহায্য করতে পারি না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এশিয়ার সামনে অকল্পনীয় (নেতিবাচক অর্থে) ভবিষ্যত্ অপেক্ষা করছে’।
ভাসুকি শাস্ত্রী এশিয়ার অর্থনীতির ভবিষ্যত্ সম্বন্ধে মন খারাপ করে দেওয়ার মতো কঠিন সব শব্দ ব্যবহার করেছেন সত্য, কিন্তু তার দেওয়া এমন অনুভূতি-আশ্রিত মতামত অভূতপূর্ব নয়। ১০ বছর আগে তিনি হংকং-ভিত্তিক বিশিষ্ট বিবরণদাতা ফিলিপ বাওরিংকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন এ অঞ্চলের ভবিষ্যতের ব্যাপারে একটি প্রবন্ধ লেখার। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যতের মূল নিয়ামক নিহিত, এমন মতামতের দৃঢ় সমর্থক হিসেবে ভাসুকি সেই প্রবন্ধটি পড়ে একেবারে তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পূর্ব এশিয়ার উত্থানকে অনুসরণ করে আসছেন ফিলিপ বাওরিং। এ অঞ্চলের সাফল্যে তিনি বাড়তি সুবিধা ভোগের পাশাপাশি স্ফূর্তিও করেছেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু লেখার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের ছিটেফোঁটাটি পর্যন্ত নেই, ‘আমি বলতে পারি না যে, একবিংশ শতাব্দী এই অঞ্চলের, এমন মতবাদের বিশ্বাসীদের একজন আমিও। বস্তুত তিনি লেখার সারমর্ম টেনেছেন এভাবে—২০২২ সাল নাগাদ ‘এশীয় শতাব্দী’ তার অর্ধেকটা পার করে ফেলতে পারে।
‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’-এর প্রাক্তন সম্পাদক বাওরিং পূর্ব এশীয় অঞ্চলের জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জকে সামনে টেনে এনেছেন। এ অঞ্চলের অনেক দেশ বুড়িয়ে যাওয়া জনসংখ্যা ও প্রতিস্থাপন হারের পেছনে থাকা হ্রাসমান প্রজননধারাকে মোকাবিলা করতে গিয়েই হাঁসফাঁস করছে। আর মাঝারি-আয়ের ফাঁদ বিষয়টি হচ্ছে, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশের পক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অগ্রসর অর্থনীতি হওয়ার চেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত উচ্চতর উত্পাদনশীলতা ও দক্ষতা অর্জন করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। দুর্বল আয় বিন্যাস তথা অসমতা, গণবাজারের ভোগ্যপণ্যের সীমিত চাহিদা, এসবই শিল্প উন্নয়নকে ঢাকনা পরিয়ে রাখছে। কিছু দেশ অবশ্য নিজস্ব দেশজ ব্র্যান্ডের উন্নয়ন ঘটাতে সমর্থ হয়ে তা বিশ্ববাজারে নিয়ে যেতে পেরেছিল। বাওরিং-এর মতে এসব সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল মূলত জিডিপির অত্যন্ত সংকীর্ণ সংজ্ঞার কারণে। এই জিডিপি শিক্ষাসহ স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, লিঙ্গবৈষম্য, সুশাসন এবং বাস্তবিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে হিসাবে আনে না।
জিডিপির বিচারে হলেও হতে পারে একবিংশ শতাব্দীটা এশিয়ার, যতি প্রবৃদ্ধির জয়রথ অব্যাহত থাকে। কিন্তু শুভংকরের ফাঁকিটা মালয়েশিয়ার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক সংকটের বছরে নাজিব রাজাক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল মাইনাস ১ দশমিক ৫ শতাংশ। তার নেতৃত্বে পরের বছরেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন ৬ শতাংশে। ২০১৭ সালে এক বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ২০ লাখেরও বেশি চাকরি সৃষ্টি হয়েছে, বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি নেমে এসেছে। বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ পৌঁছেছে অভূতপূূর্ব স্তরে। তিনি এ কথাও বলেছিলেন যে, বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থাতেও আমাদেও উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখে অগ্রসর অর্থনীতিগুলো পর্যন্ত হিংসা করছে। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাজাকের উন্নয়নের ফিরিস্তি ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলতে পারেনি। চমক জাগানো জিডিপির সুফল বিশেষত গরিবদের কাছে না পৌঁছাটাই তার বিদায়ঘণ্টা বেজে যাওয়ার মূল হেতু।
—দ্য ন্যাশনাল অনুসরণে
