মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের মর্গের বেহাদ দশা। কার্যত জনবল সংকট, অপ্রতুল যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগতসহ নানা সমস্যায় খুঁড়িয়ে চলছে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের পুরো ফরেনসিক বিভাগই। হাসপাতালের স্যাঁতসেঁতে মর্গে লাশ সংরক্ষণের মরচুয়ারি কুলার, এসি বিকল হওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে লাশের ময়নাতদন্ত নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
কুমেক সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৯ সালের ২৮ মে কুমিল্লা শহরতলির কুচাইতলী এলাকায় এ কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮২ সালে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ১৯৯২ সালে কলেজটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। এ হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে আসা এক থেকে দেড় হাজার রোগী প্রতিদিন চিকিত্সাসেবা নিয়ে থাকেন। ১৯৯৫ সালে হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্তের কাজ শুরু হয়।
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, কলেজটির উত্তর পাশের পুরোনো একটি ভবনের নিচতলায় স্যাঁতসেঁতে কক্ষে পরিচালনা করা হয় ময়নাতদন্তের কাজ। ফরেনসিক বিভাগে জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। অবকাঠামোও সুবিধাজনক নয়। জনবল হিসেবে আছেন এক জন সহকারী অধ্যাপক ও দুই জন প্রভাষক। কর্মচারী হিসেবে আছেন এক জন মর্গ সহকারী (ডোম), এক জন অফিস সহকারী ও দুই জন অফিস সহায়ক। শূন্য রয়েছে এক জন করে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও প্রভাষকের পদ। ময়নাতদন্তের কক্ষের এসি বিকল ও চারটি মরদেহ রাখার মরচুয়ারি ফ্রিজটি প্রায় দুই বছর ধরে বিকল হয়ে আছে। ময়নাতদন্তের পাশাপাশি ক্লাস, পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়ন ও আদালতে মামলার সাক্ষ্য দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় সামলাতে হচ্ছে অল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে। মর্গ সমস্যার কারণে কলেজের শিক্ষার্থীদের অনেকেই ফরেনসিক বিভাগের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। সূত্র জানায়, প্রতি বছর এখানে গড়ে সাত শতাধিক মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। ২০২০ সালে এখানে ময়নাতদন্ত হয়েছে ৭৪৪ জনের। চলতি বছরের ২৮ আগস্ট পর্যন্ত ময়নাতদন্ত হয়েছে ৫৫৬ জনের। এছাড়া ধর্ষণের অভিযোগে ভিকটিমদের ডাক্তারি পরীক্ষার পাশাপাশি বয়স নির্ধারণসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছে ১৯৮ জনের। ফরেনসিক বিভাগে দুই যুগেও আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগায় ময়নাতদন্তের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক অনুশীলন কার্যক্রমও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ময়নাতদন্ত কক্ষের এসি বিকল থাকায় দুর্গন্ধের কারণে গলিত, অর্ধগলিত লাশ নিয়ে কাজ করতে ও ব্যবহারিক শিক্ষা নিতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারাচ্ছে। এসব কারণে এ বিভাগে চিকিত্সকসংকটও কাটছে না। বিভাগের ডোম (মর্গ সহকারী) মাহে আলম জানান, পুলিশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সকদের পরামর্শ মতে লাশ কাটি। এখানে লাশ কাটার উপকরণ, পানি ও নানা সংকট রয়েছে। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা জানান, এ বিভাগে আমাদের তিন জনকে শিক্ষা কার্যক্রম ও ময়নাতদন্তের পাশাপাশি মামলায় সাক্ষ্য দিতে আদালতেও যেতে হয়। এছাড়া ভিকটিমদের ডাক্তারি পরীক্ষা, বয়স নির্ধারণসহ ডিএনএ নমুনা নিতে হয়। তিনি আরো জানান, মর্গের মরচুয়ারি কুলার বিকল থাকায় লাশ গরমে ফুলে ওঠায় অনেক সময় ময়নাতদন্ত করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ট্রান্সপোর্ট সমস্যার কারণে অনেকে লাশ রাখতে চাইলে সেটাও করা যাচ্ছে না। এসব সমস্যার সমাধানে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মোস্তফা আজাদ কামাল জানান, বিকল মরচুয়ারি কুলার, এসি ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া জনবল সংকটের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে, তবে কখন জনবল চাহিদা পূরণ হবে এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
