মার্কিন সেনা আফগান ভূখণ্ড ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তালেবানের দ্বিমুখী চেহারা প্রকট হয়ে উঠছে। একদিকে ওরা বলছে, ভয়ের কারণ নেই। মহিলা, সংখ্যালঘুসহ দেশের সব মানুষের নিরাপত্তা আমরা ফিরিয়ে দেব। রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র হবে ধর্ম অনুশাসিত। আরেক দিকে তাদের অতি উত্সাহীরা প্রকাশ্য রাস্তায় বেরিয়ে তাণ্ডব শুরু করেছে। কাবুল বিমানবন্দর এখন পুরোপুরি তালেবানের দখলে। দেশত্যাগে ইচ্ছুক জনতার উড়ানপথে পালাবার উপায় নেই। গত ৩১ আগস্ট এক অসহায় ব্যক্তিকে ব্ল্যাক হোল হেলিকপ্টারে ঝোলানো অবস্থায় দেখা গেছে কান্দাহারের আকাশে। হাড় হিম করা খবর বর্বরতার জঘন্যতম দৃষ্টান্ত।
অনেকের ধারণা, নব্বইয়ের দশকের তালেবান বদলে গেছে। এবার বাধ্যতামূলক মানবিক মুখ দেখাতে চাইবে। কিন্তু এ পর্যন্ত যে সমস্ত লক্ষণ স্পষ্ট, তাতে মনে হচ্ছে তালেবান তালেবানেই আছে। বদলায়নি, চাইলেও বদলাতে পারবে না। অভ্যন্তরীণ চাপ তাদের উগ্রতার বদল মানবে না। এক্ষেত্রে তাদের স্বাভাবিক মিত্র আইএসআই, আইএস, আল-কায়েদা এবং পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো হুমকি চাপানোর চেষ্টা করবে। ইতিমধ্যে আল-কায়েদা তালেবানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, কাশ্মীরকে শত্রুদের কবল থেকে মুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি সোমালিয়া, ইয়েমেন ও অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি থেকে দুশমনদের তাড়াতে হবে। মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবানের প্রথম সরকারের চালিকাশক্তি ছিল আল-কায়েদা। দ্বিতীয় শক্তি পাকিস্তানের আইএসআই। তৃতীয়, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন উগ্রপন্থি সংগঠন, যারা ধর্মের নামে অধর্মের রাজত্ব কায়েম করতে বড্ড বেশি আগ্রহী। এবার আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসায় সব জঙ্গিই উদ্বুদ্ধ। মূলত তালেবান আর আল-কায়েদার মদ্যে আদর্শগত ফারাক নেই। তারা একে অপরের সহায়তাকারি। ভারতেও তাদের অতি উত্সাহের লক্ষণ নজরে আসছে। এদের ধর্ম যা-ই হোক না কেন, ধর্মকে ব্যবহার করেই তারা ক্ষমতায় থাকতে চায়। ক্ষমতার পরিধি আরো বাড়াতে চায়। শান্তির ধর্মকে ব্যবহার করেই তারা মানুষের উপর নিজস্ব গোরা মতবাদ চাপিয়ে দিয়ে থাকে। এখানে তালেবানের সঙ্গে আল-কায়েদা, ইসলামি স্টেটের সশস্ত্ররা (আইএস), হিজব-এ-মুজাহিদ্দিন, লস্কর-এ-তৈয়বা, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন, মিশরের ইখয়ানুন মুসলিমিন কিংবা হিন্দু শিবসেনা বা গেরুয়া সেবক সংঘের লক্ষ্যের দূরত্ব কোথায়? সবাই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিষবৃক্ষের চারা এক দেশে বাড়লে, আরেক দেশেও বিষ চাষ বেড়ে ওঠে। এটাই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের নিয়মের স্বাভাবিক রুটিন। মোল্লা ওমরের মৃত্যু আর ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ডের পর পূর্ব-পশ্চিমের ধারণা ছিল, সন্ত্রাসবাদ থমকে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটল? ধর্মশাসিত শাসনতন্ত্র স্থাপনের মোহ ছড়িয়ে দিলেন
আবু বক্কর বাগদাদি। প্রথমে ইরাকে, দ্বিতীয়ত সিরিয়ায়, তৃতীয়ত তাদের সহযোগীরা লেবানন, আলজিরিয়া, পাকিস্তান, আফিগানস্তানসহ এশিয়ার নানা প্রান্তে হিংসার বিপ্লব ছড়িয়ে দেয়। বাগদাদিও নিকাশ হলেন একদিন। তবু ঐ স্বপ্নের দুঃস্বপ্ন ডালপালা ছড়াতে থাকল। গত কুড়ি বছরে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার উপস্থিতি কি বিলকুলই টের পেল না যে, গোকুলে, তালেবানের আড়ালে ওরাও বাড়ছে। ‘আল-কায়েদা খুরাসান’ নিছক আঞ্চলিক শক্তি নয়, আফগানিস্তানের সব প্রদেশেই লাদেনের ছত্রভঙ্গ সেনারা গোপনে জড়ো হতে থাকে এবং এদের সক্রিয় সহযোগিতায় তালেবান ধীরে ধীরে বাহু বিস্তার করতে থাকে। যারা বলছেন, কেবল তালেবান আফগানভূমি পুনর্দখল করেছে, তাদের মূল্যায়ন ও হিসাবে বিস্তর ভুল আছে। সামনে তালেবান, আর পেছনে ছিল বহুজাতিক খতরনাক জঙ্গিরা। তালেবানের কাবুল দখলের পরপর মুখোশ খুলে কিংবা মুখোশ পরেও তারা প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসছে এবং তাণ্ডবের বর্বরতা চাঙ্গা করে দিচ্ছে। দোহায় স্বনির্বাসিত তালেবান শিবিরের ছত্রছায়ায় আমরা মধ্যমপিন্থীদের ছদ্মবেশী মুখ দেখেছি। কিন্তু আড়ালের ভয়ংকর দৈত্যরা ক্রমাগত চাপ তৈরি করতে থাকে। এই চাপের এক বার্তা, অবিলম্বে আফগান ভূখণ্ড থেকে বিদেশি সেনা সরাও। নির্বাচিত সরকারকে হটাও। আরেক বার্তা, সন্ত্রাস ছড়িয়ে সন্ত্রাসের তত্ত্বকে কায়েম করো। দুটো বার্তার পেছনেই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের হাত উপেক্ষা করা অবাস্তব। আমাদের বিশ্বাস, তালেবান জঙ্গিতত্ত্ব এড়াতে পারবে না। চাইলেও তাদের চাপে রাখবে আল-কায়েদা ও আইএস। পাকিস্তানও চুপ করে বসে থাকবে না। কারণ পাশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতরাজা বড়ো বেশি প্রতাপশালী। প্রভাবশালীও। কাশ্মীর সে ছাড়বে না। ছাড়তে পারে না। কাশ্মীর হাতছাড়া হওয়া মানেই দিল্লির ঘোর সংকট। এ কারণেই ইসলামাবাদ তার অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে জঙ্গি তালেবানের যোগাযোগ বহাল রাখতে চাইবে। ভারতের মনোভাব সুনির্দিষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমনে নয়াদিল্লি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্সসহ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির ঘোষিত সঙ্গী। পশ্চিম এশিয়ার আরব ভূখণ্ড রাজনৈতিক উগ্রতার পরিপন্থি। অতএব ভারত তাদেরও সহযোগী। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে তার অবস্থা বড্ড স্পর্শকাতর। যে কোনো উপায়ে তালেবানের মধ্যমপন্থিদের সহযোগিতা দাবি করবে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে এদের দূরত্ব বাড়াতে চাইবে। সম্ভবত এ কারণেই ৩১ আগস্ট দোহায় ভারতীয় দূত তালেবান দূতের সঙ্গে কথা বলেছেন। কথার আড়ালে কথা পড়ে রয়। সত্যের বাস্তব নিঃসন্দেহে আলাদা। তালেবানকে প্রকারান্তরে পাশে চাইবে দিল্লি। এখানে শাসক তালেবানের বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করা অসম্ভব। দুই পক্ষই সম্পর্কের স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে। আগের তালেবান সরকারকে ভারত স্বীকৃতি দেয়নি। এবার তার অবস্থান কী হবে বলা মুশকিল। সম্ভবত প্রকাশ্যে নতুন সরকারের অস্তিত্ব মানবে না। তবে কি আড়ালে তাদের মধ্যমপন্থার প্রতিনিধিদের বাহুডোরে রাখতে চাইবে দিল্লি? আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বহু জাতি-উপজাতির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তালেবানের আদর্শগত ঐক্যের সংকট আছে। এক দল চায় ধর্মের নামে অনুশাসিত শাসনতন্ত্রের দ্রুত বিস্তার (যা আক্ষরিক অর্থে নৈরাজ্য আর অধর্মেরই শাসনব্যবস্থা); আরেক গোষ্ঠীর কাম্য, ধীর গতিতে রাষ্ট্র শাসনের পরিবর্তন। এই গৃহ সংকটে জয়ী হবে কে? ইরানের মতো কট্টর শিয়াশাসিত রাষ্ট্রেও ধর্মীয় শাসন সর্বত্র গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য আয়াতুল্লাহদের অনেক সময় আপস করতে হয়েছে। পুরোপুরি শিয়াতন্ত্র তারা বহাল রাখতে পারেননি। আজও এ সংকট চলছে। আফগানিস্তানেও এরকম দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলা অসম্ভব। আধুনিক ইসলামি বিশ্বের কোথাও অনুশাসিত শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়নি। সুন্নি আফগানিস্তানেও সম্ভব হবে না। নব ঔপনিবেশিকতাবাদ তার নিজের ভেতরে মুক্তচিন্তা আর গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা চাইলেও ইসলামি বিশ্বে অন্ধতাকে সে উসকানি দেয়। কেননা এতে তার বাজারের শক্তি বাড়ে। উপদ্রুত বিশ্বও তাঁবেদার থাকতে বাধ্য হয়। সিরিয়া, ইরাক, ইরান ও পাকিস্তান নিয়ে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীনের দৃষ্টিকটু অবস্থান আমরা দেখেছি। এবার আফগানিস্তানেও উপদ্রবের চাষবাস আরো বেশি দেখব। অতএব কাবুলে যে কোনো শাসনতন্ত্র স্থাপিত হোক না কেন, তা নিরক্ত, সন্ত্রাসহীন হবে না। রক্ত খেলার বৃত্ত বাড়তে থাকবে। ইতিমধ্যে জঘন্য কাণ্ডে অবাক বিশ্ব। গান নিষিদ্ধ, ছবি আঁকা নিষিদ্ধ, অভিনয় নিষিদ্ধ। মহিলাদের দিন যাপনেও আরোপিত সন্ত্রাস ঝাঁপিয়ে পড়ছে। হিবাতুল্লাহ কিংবা বরাদর সহজে তা রুখতে পারবেন না। সম্ভাব্য সরকারও টিকবে না। দিন বদলাবে না। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাজা আসে যায় রাজা’ কিংবা ষাটের দশকের দুঃসাহসী কবিতার পুরুষ আবুল হাসানের ‘রাজা আসে রাজা যায়’ পঙিক্তগুলি অবিশ্বাস্য বাস্তবকে আরো বেশি প্রকট করে তুলবে। আমাদের ডান দিকে। বাঁ দিকে। পূর্ব ও পশ্চিমে।
n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা
