জননেতা প্রয়াত এম আব্দুর রহিম (১৯২৭-২০১৬) ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক বিশ্বস্ত সহকর্মী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংবিধান প্রণেতাদের একজন, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত (২০১৮)। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার (২৬ মার্চ) পর বাংলার সর্বত্র প্রতিরোধযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭১-এ মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। তার স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার মাধ্যমে শত্রুমুক্ত করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন মুজিবনগর সরকারের সংগঠকবৃন্দ। এই মুজিবনগর সরকারের সাংগঠনিক দায়িত্ব পরিচালনায় পশ্চিম জোন-১-এর চেয়ারম্যান ছিলেন দিনাজপুরের এমপিএ এম আব্দুর রহিম। এজন্য যুদ্ধকালীন তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার প্রস্তুতির ব্যবস্থাপনায়, শরণার্থীদের আবাসন, খাদ্যসহ নানা সমস্যা সমাধানে সীমান্তবর্তী ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে বিরামহীন ছুটে বেড়িয়েছেন। সচেষ্ট ছিলেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সা ও শহিদদের সত্কারের ব্যবস্থাপনায়। এ সময় যুদ্ধশিবির গড়ে তোলা এবং প্রশিক্ষণের আয়োজন ছিল তার অন্যতম দায়িত্ব। বিপুল শরণার্থীর দেখাশোনা এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থায় সমন্বয়ের জন্য সীমান্তের দাউদপুরের ফকিরগঞ্জ হাটে তিনি ‘জয়বাংলা অফিস’ স্থাপন করেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠা ১০ এপ্রিল এবং মুজিবনগর সরকারের শপথ হয় ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরে। মুজিনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আঞ্চলিক প্রশাসন স্থাপন ও পরিচালনা ছিল এই সরকারের নতুন চিন্তাধারার ফসল। পূর্ণাঙ্গ সরকার প্রতিষ্ঠা করে তার অধীন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা প্রদান ছিল আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধানতম লক্ষ্য। তাই রাজনৈতিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য জোনাল কাউন্সিল গড়ে তোলা হয়। মুজিবনগর সরকারের স্থানীয় দপ্তরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আঞ্চলিক প্রশাসন জোনসমূহ; যার অধীনে বিভিন্ন এলাকার প্রশাসন পরিচালিত। এসব জোন চেয়ারম্যানের অধীনে শরণার্থী শিবির ও যুব ক্যাম্প গড়ে ওঠে। যুদ্ধাঞ্চলকে ১১টি জোনে ভাগ করে এসব জোনাল কাউন্সিলের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের। যুদ্ধ পরিচালনায় বিভিন্ন সেক্টরের মতোই জোনাল কাউন্সিল গঠিত হয় এবং পরিচালনার জন্য স্থানীয় সাংসদগণ থেকে একজন চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হয়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের মন্ত্রিসভায় ১১টি সেক্টরের সঙ্গে ১১টি আঞ্চলিক পরিষদ (Zonal Council) প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক সাংসদগণ এই জোনাল কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। অঞ্চলভিত্তিক সাংসদ কর্তৃক প্রত্যক্ষ ভোটে ১১টি জোনাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
১১টি প্রশাসনিক জোনের মধ্যে দিনাজপুর ও বগুড়া অঞ্চলের পশ্চিম জোন-১ ছিল উল্লেখযোগ্য। এমএনএ আজিজুর রহমানের সভাপতিত্বে ৩৮ জন সাংসদ ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় জোনাল চেয়ারম্যান এবং বিভিন্ন সাব-কমিটির নির্বাচন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ২৬ সেপ্টেম্বর বালুরঘাট অফিসের সভায় এই অঞ্চলের সাংসদদের প্রত্যক্ষ ভোটে পশ্চিম জোন-১-এর চেয়ারম্যান হিসেবে এম আব্দুর রহিমকে নির্বাচিত করা হয়। সে সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার মোহনলাল, একজন মেজর ও সেক্টরপ্রধান লে. কর্নেল কাজী নুর উজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
বৃহত্তর দিনাজপুর ও বগুড়ার জোনাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এম আব্দুর রহিমকে প্রশাসনিক সহযোগিতার জন্য কর্মকর্তা (Zonal Administrator) ও দপ্তর কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। জোনের কার্যক্রম পরিচালনায় সাব-কমিটি ছিল অর্থ, ত্রাণ, স্বাস্থ্য, প্রচার, ও শিক্ষা উপ-কমিটি। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন দিনাজপুরের এডিসি এম এ আবুল কাশেম। অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রউফ ও জেলা আনসার অ্যাডজুটেন্ট শরিফুল হক এবং দপ্তর সচিব ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় ৬ ও ৭ নম্বর সেক্টরের দিনাজপুর এবং বগুড়া জেলার বৃহত্ অঞ্চল ছিল পশ্চিম জোন-১-এর ভৌগোলিক পরিসীমা। পশ্চিমাঞ্চল জোন-১-এর অফিস ছিল গঙ্গারামপুর এবং একটি সাব অফিস ছিল রায়গঞ্জে। রায়গঞ্জ সাব অফিসে এম আব্দুর রহিমকে সাহায্য করেন অ্যাডভোকেট আজিজুল ইসলাম জগলু এবং এস এ বারী এ.টি.। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুকদের সামরিক প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে মুজিবনগর সরকার জুন মাসে ‘যুব শিবির নিয়ন্ত্রণ পরিষদ’ গঠন করে। এম আব্দুর রহিমের পরিচালনায় সীমান্তের কাছাকাছি ১২টি যুব-অভ্যর্থনা শিবির ছিল। এম আব্দুর রহিমের সাংগঠনিক পরিচালনায় পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন অভ্যর্থনা শিবির ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে ওঠে।
জোনাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে এম আব্দুর রহিমের দায়িত্ব ছিল যৌথ বাহিনী থেকে ক্রমশ মুক্তাঞ্চলের প্রশাসনিক ক্ষমতা গ্রহণ করা। এর পরিপ্রেক্ষিতে পঞ্চগড় শত্রুমুক্ত হলে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের জন্য এম আব্দুর রহিম ১২ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ে গমন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন দিনাজপুরের ডিসি ফয়েজউদ্দিন আহমদ ও পুলিশ সুপার। পরের দিন ১৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ১৪ ডিসেম্বর দিনাজপুর হানাদারমুক্ত হলেও তিনি প্রবেশ করতে পারেননি। কারণ যৌথ বাহিনীর সৈন্যরা ১৪ ডিসেম্বর গঙ্গারামপুর থেকে দিনাজপুরে প্রবেশ করলে ঘুঘুডাঙ্গায় মাইন বিস্ফোরণে তাদের দুটি ট্রাক উড়ে গিয়ে শতাধিক সৈন্য হতাহত হন। যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন রাস্তায় ব্যাপক মাইন পুঁতে রেখেছিল।
এদিকে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় উত্সব উদ্যাপন করলেও দিনাজপুরে আনুষ্ঠানিক উত্সব হয় কয়েক দিন পর। তবে ১৭ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের আগেই বিভিন্ন রণাঙ্গন থেকে বিজয়ী মুক্তিসেনারা বীরদর্পে শহরে প্রবেশ করেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করায় দিনাজপুরে যুদ্ধরত হানাদারেরা সৈয়দপুরে পালিয়ে যায়। পরে সৈয়দপুরে তারা আত্মসমর্পণ করে। এম আব্দুর রহিম বগুড়া জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৭ ডিসেম্বর সীমান্তবর্তী হিলি দিয়ে ঘোড়াঘাটের রানীগঞ্জ হয়ে বগুড়ায় গিয়ে ১৮ ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনীর কাছ থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের তত্কালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান এমএনএর সভাপতিত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন শেষে জোনাল চেয়ারম্যান এম আব্দুর রহিম আবেগাপ্লুত হন এবং অভিনন্দন বক্তব্য প্রদান করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ জনপ্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর শহিদ ও আহতদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি করেন। দিনাজপুরের প্রিয় নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নৈতিক রাজনীতির সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব এম আব্দুর রহিমের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে (৪ সেপ্টেম্বর ২০২১) তাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
n লেখক :অধ্যক্ষ, দিনাজপুর সরকারি সিটি কলেজ, দিনাজপুর
