প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসাবে পরিচিত শকুন বর্তমানে পৃথিবীর মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। মৃত জীবজন্তুর মাংস খেয়ে পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীতে ১৮ প্রজাতির শকুন রয়েছে। বাংলাদেশে আগে ছিল ৬ প্রজাতির শকুন। এখন কেবল ‘বাংলা শকুন’ই কোনোমতে টিকে আছে। বিশ্বে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার ‘শকুন দিবস’ পালন করা হয়। শকুনকে বাঁচাতে জনসচেতনতা সৃষ্টিই এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য।
শকুন তীক্ষ দৃষ্টির অধিকারী। অনেক ওপর থেকে মৃত পশুর দেহ দেখতে পেয়ে নিচে নেমে আসে এবং দ্রুত সাবাড় করে। এভাবেই শকুন প্রকৃতি থেকে বর্জ্য অপসারণ করে রোগব্যাধিমুক্ত পরিবেশ সুরক্ষা করছিল। গবাদি পশুর মৃতদেহের রোগ-জীবাণু সহজে মরে না। এগুলো সংক্রমিত হয়। কিন্তু শকুনের পেটে দ্রুত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শকুনের পাকস্থলীর জারণক্ষমতা খুব বেশি। মৃত পশুর দেহ তো বটেই, তাদের হাড় পর্যন্ত হজম করে ফেলতে পারে। ফলে রোগ বিস্তার রোধ হয়। এখন আর আগের মতো শকুন নেই। ফলে পরিবেশও প্রাকৃতিকভাবে পরিষ্কার না হওয়ায় রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে।
পৃথিবীজুড়ে শকুনের অবস্থা খুবই নাজুক। গবেষকরা জানিয়েছেন শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ শকুনই এখন নেই। এজন্যেই অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা, ক্যান্সার, পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বিগত তিন দশকে বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৯৯ ভাগ শকুন মারা গেছে। গবেষকরা শকুন কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন গবাদিপশুতে ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেন ওষুধের ব্যবহার। এ ওষুধ প্রয়োগ করা কোনো প্রাণীর মৃতদেহ শকুনের পেটে গেলে কিডনি নষ্ট হয়ে শকুনের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে পানিদূষণ, খাবার সংকট, কবিরাজি ওষুধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার, বিমান-ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ, ঘুড়ির সুতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, ইউরিক অ্যাসিডের প্রভাবে বিভিন্ন রোগ, বাসস্থানের অভাব প্রভৃতি কারণে শকুন বিলুপ্ত হচ্ছে।
মাত্র তিন দশক আগেও কমপক্ষে ১০ লাখ শকুনের বিচরণক্ষেত্র ছিল বাংলাদেশের আকাশ। সেই সংখ্যা এখন নেমে এসেছে ২৬০-এ! বাংলা শকুন এখন মহাবিপন্ন প্রজাতির প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে যে ক’টি শকুন আছে তার বেশির ভাগই রয়েছে সুন্দরবন এলাকায়। কিছু আছে শ্রীমঙ্গলের কালাছড়া ও হবিগঞ্জের রেমা কালেঙ্গায়। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এদেশ শকুনশূন্য হয়ে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। দেশে থাকা অল্পসংখ্যক শকুন রক্ষায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোট আইইউসিএন-এর গবেষকরা বলেন, বাংলাদেশে একসময় রাজশকুনের রাজত্ব ছিল। ৪০ বছর হলো সেটি বিলুপ্ত হয়েছে। শকুনের সংখ্যা বাড়াতে আইইউসিএন বন অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যে দেশে দুটি নিরাপদ জোন ঘোষণা করা হয়েছে। তবে আশার কথা, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শকুন সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশেও শকুন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ছে, গবেষণাধর্মী কাজকর্মও হচ্ছে। সিলেট ও খুলনা অঞ্চলে দুটি সেফ জোন স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে শকুন সুরক্ষায় বিভিন্ন ধরনের গবেষণা কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রতি বছর অন্তত ১০ থেকে ১২টি শকুন বাড়ছে।
শকুনের সংকটে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে সচেতনতা। শকুন যে আমাদের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শকুন হচ্ছে সবচেয়ে বিপন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণী। আমাদের সহানুভূতি ও ভালোবাসা তাদের দরকার। তারা যেন আকাশে উড়ে বেড়াতে পারে।
খুলনা
