ছোট-বড় প্রায় ৭০০ নদ-নদীর এই বাংলাদেশ—যার ৫৭টি আন্তর্জাতিক, ৫৪টি ভারতের এবং তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত। উত্পত্তি এবং সমাপ্তি দেশের ভিতর এমন অনেক নদী থাকলেও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের হালদা বিশ্বের একমাত্র জোয়ারভাটার নদী, যেখানে রুই জাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে এবং নিষিক্ত ডিম বাণিজ্যিকভাবে সংগ্রহ করা হয়। আর প্রকৃতির এমন সখ্য বিশ্বের কোথাও নেই। প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই হালদা পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়ের পাহাড়শ্রেণি থেকে সৃষ্টি। এরপর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারি ও রাউজান উপজেলা হয়ে বুড়িশ্চরের কাছে কর্ণফুলি নদীতে পড়েছে। প্রায় ৩৪টি পাহাড়িছড়া, ১৮টি খাল, ২৩টি কুম (গভীর খাদ), ১১টি বাঁক, কাপ্তাই লেক ও জোয়ারভাটা হালদার পানি সঞ্চালনে ভূমিকা রাখছে। চট্টগ্রাম শহরের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে হালদা প্রতিদিন এক কোটি লিটার পানি সরবরাহ করছে। স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার পাশাপাশি হালদা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
বাংলাদেশের জলসীমায় চারটি মেজর কার্পের (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ) স্টক থাকলেও তিনটি স্টকে (ব্রহ্মপুত্র-যমুনা স্টক, গঙ্গা-পদ্মা স্টক, বারাক-মেঘনা স্টক) মাছ ডিম ছাড়ে উজান এলাকায় ইন্ডিয়ায়। এসব উজান এলাকা থেকে রেণু পোনা বাংলাদেশে ঢোকে। আমাদের নদীগুলোতে শুধু পোনা আহরণ করা হয়। রেণু পোনা পাওয়া যায় না বললেই চলে। ঐ তিনটি স্টকই মিক্সড। কিন্তু হালদার সঙ্গে কোনো নদীর সংযোগ না থাকায় এখানকার কার্প জাতীয় মাছের জীনগত স্টক সম্পূর্ণ অবিকৃত রয়েছে। প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় অনুঘটক নদীর বাঁক, নদীর স্রোত, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, ঘোলাত্ব, পিএইচ মাত্রা, লবণাক্ততা, দ্রবীভূত অক্সিজেন, এবং চাঁদের অবস্থান (পূর্ণিমা/অমাবস্যা) ইত্যাদি ভৌত, রাসায়নিক ও প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ এপ্রিল থেকে জুন পযর্ন্ত সময়জুড়ে রুই জাতীয় মাছের প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে। ফলে এই সময় হালদায় মত্স্যজীবীদের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের উত্সবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দেশের অসংখ্য বেসরকারি মত্স্য হ্যাচারিতে প্রজননের নিয়ম বহির্ভূত উত্পন্ন কার্প জাতীয় পোনা মত্স্য সম্পদের ভবিষ্যেক যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে, সেখানে হালদার জীনগত বিশুদ্ধ স্টকই এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
কিন্তু দুঃখজনক যে, অনন্য এই হালদা এখন বিপন্ন হালদা। দখল, দূষণ আর লবণে এর প্রাণ যায় যায়। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৪৫ সালে হালদা থেকে সংগৃহীত রুই জাতীয় মাছের ডিম ও রেণু যথাক্রমে ১৩৬৫০০ কেজি ও ৫০০০ কেজি এবং ২০২০ সালে এটি যথাক্রমে ২৪৫৬০ কেজি ও ৩২০ কেজি। ইতিমধ্যে হালদার ১৫ প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হালদানির্ভর দুকূলের ৬৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা ছাড়াও জাতীয় অর্থনীতির একটি মূল্যবান ক্ষেত্র এখন বিপন্ন। নদীর বাঁক কর্তন, ইটভাটা, মিলকারখানার বর্জ্য, ড্রেজিং দিয়ে বালু উত্তোলন, সংযোগকারী খালগুলোর মুখে স্লুইসগেট তৈরি, ইঞ্জিনবোটের শব্দ, রাবার ড্যাম নির্মাণ, ফসলের খেতের কীটনাশক হালদার পানিতে পতিত হওয়া, মা মাছ ধরা এবং লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কারণে এখানকার মত্স্যকুলের প্রাকৃতিক প্রজনন পরিবেশটি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে হালদা এখন আগের মতো আর হাসছে না। জেলেদের উত্সবমুখর সেইদিন আর নেই। জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রের অভিপ্রায়ণ, জলবায়ুর পরিবর্তন ও মনুষ্যসৃষ্ট পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়ে হালদা এখন গবেষণার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার হালদা বিষয়ে সচেতন হয়েছে এবং জীববৈচিত্র্যের শঙ্কিত প্রজাতিসমুহ স্বস্থানিক সংরক্ষণের জন্য বিজ্ঞান বা বৈশ্বিকভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং অতি প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক বসতি হিসেবে হালদাকে বঙ্গবন্ধু হেরিটেজ ঘোষণা করে। গঠিত হয়েছে হালদা নদী রক্ষা কমিশন, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষি, পরিবেশ, পানিসম্পদ, স্বরাষ্ট্র ও মত্স্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যাযের কর্মকর্তাগণ, সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের প্রধানগণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ, সুফলভোগী প্রতিনিধিগণ ও স্থানীয় সাংবাদিকমহল।গঠিত হয়েছে হালদা নদী গবেষণা কেন্দ্র। এরই মাঝে এনজিও পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর ইত্যাদি এলাকার মতো হালদা আবার ফিরে পাবে প্রাণ; আবার রুই-কাতলার নিষিক্ত ডিমে ভরপুর হবে জাল-জলাশয়। তবে হালদা যেন শুধুই গবেষণার পর্যায়ে না থাকে।
যশোর
