করোনা ডেঙ্গু বন্যা নদীভাঙন পাহাড়ধস

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:১৩

 ‘কোভিড-১৯’ বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে করোনার দাপট চলছে। কবে নাগাদ করোনাকালের সমাপ্তি ঘটবে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।  প্লেগ, ফ্লু, কলেরা, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্তর মতো মহামারিও মানবজাতির জন্য মহাসংকট বয়ে নিয়ে এসেছিল। তবে প্রাণ-প্রকৃতির সহাবস্থান করোনাকালের অন্যতম শিক্ষা।

বর্ষা মৌসুম এলেই ডেঙ্গু, বন্যা, নদীভাঙন, পাহাড়ধস যেন নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। ডেঙ্গু এ বছরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখানে কতগুলো বিষয় ভাবা জরুরি। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শহরের খাল ও নালাগুলো পরিষ্কার রাখা। এই কাজটি করতে পারলে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। আর বাকি থাকে বিভিন্ন স্থাপনা ও আবাসস্থলের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়টি। যার যার অবস্থান থেকে নগরবাসীর দ্বারা এই কাজটি করতে পারলে এডিসের বংশ ধ্বংস করা সম্ভব। খাল-নালা-স্থাপনা-বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ সারা বছর ধরে করতে হবে। তবে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর বিস্তার বিবেচনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকসমাজকে সম্পৃক্ত করে কাজটি অতি বেশি গুরুত্ব দিয়ে করতে পারলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু রোধ করা যাবে। 

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। বিপত্সীমার ওপরে রয়েছে পদ্মা-যমুনা-ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-ধলেশ্বরীর পানি। এ সময় বন্যার্তদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্য সহায়তা সবচেয়ে বেশি দরকার। উত্তরাঞ্চলে বন্যার পানিতে একটার পর একটা গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। ভাটির দেশে প্রতিবছর বন্যা যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে! নদ-নদীর নাব্যতা ও সব ধরনের জলাশয় রক্ষা করা গেলে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। বন্যার সঙ্গে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। নদ-নদীতে নিয়মিত ড্রেজিং না করাও নদী ভাঙনের অন্যতম কারণ। নদ-নদীর বিভিন্ন স্থানে চর পড়ার ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণেও নদীভাঙন হয়ে থাকে। নদীপাড়ের ক্ষয়রোধে বিদেশের মতো নদীর তীরে স্থায়ী কাঠামোর কথা চিন্তা করতে হবে। কংক্রিটের বাঁধাই দিয়ে নদী তীর স্থায়ী সংরক্ষণের কথা ভাবতে হবে। বাংলাদেশের নদ-নদীর তীর সাধারণত নরম পলিমাটির হয়ে থাকে। নদী রক্ষা বাঁধ পরিকল্পিত ও স্থায়ী ভাবে তৈরি করতে হবে যেন পানির তোড়ে ভেঙে না যায়। এছাড়া নদীর তীরে বৃক্ষরোপণে জোর দিলে নদীভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে।

বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থী আসার পর পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরো বেশি বেড়ে গেছে। পাহাড়ে বসতি স্থাপনের কারণে জীবনের যেমন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তেমনি পরিবেশগত বিপর্যয়ও তৈরি হচ্ছে। এ বছর ভারী বৃষ্টিপাতে শরণার্থী শিবিরসহ উখিয়া, টেকনাফ ও মহেশখালীতে পাহাড়ধস এবং পানিতে ভেসে গিয়ে ১৫ জনের বেশি প্রাণহানি হয়েছে। বড়সড় পাহাড়ধসে মৃত্যু ঘটলে নিয়মমাফিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অতঃপর কমিটি দুর্ঘটনা রোধে কিছু সুপারিশও করে। কিন্তু কেন জানি কোন অজানা কারণে সুপারিশ আর আলোর মুখ দেখে না! আইনে বলা আছে—পাহাড়ের পাদদেশে কোনো বসতি স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু আইন আর আইনের বাস্তবায়ন তো এক কথা নয়! পাহাড়ের পাদদেশে বসতি হয়েছে এবং হচ্ছে। পাহাড়ধস রোধ করতে হলে উন্নয়নের নামে-বেনামে পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে গাছপালা ও স্থায়ী-অস্থায়ী অবাসন করা যাবে না। পাহাড় ভূপ্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে টিকে আছে যুগের পর যুগ। পাহাড়কে পাহাড়ের মতো থাকতে দিতে হবে।

ঢাকা