বিভিন্ন নামি দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ নকল করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিত একটি চক্র। এ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরা হলেন—তরিকুল ইসলাম, সৈয়দ আল মামুন, সাইদুল ইসলাম, মনোয়ার, আবদুল লতিফ, নাজমুল ঢালী ও সাগর আহমেদ মিলন। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে একমি কোম্পানির মোনাস ৭০০ বক্স, স্কয়ার কোম্পানির সেকলো ৫০ বক্স, জেনিথ কোম্পানির ন্যাপ্রোক্সে প্লাস ৭৪৮ বক্সসহ অন্যান্য কোম্পানির বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধ, ওষুধ তৈরির মেশিন, ডায়াস ও খালি বক্স। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কাজলা, আরামবাগ ও মিটফোর্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার। তিনি বলেন, আমরা আট প্রকার নকল ওষুধ উদ্ধার করেছি। যেসব ওষুধ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, সেগুলোই নকল করে বাজারজাত করছিল চক্রটি। আসল ওষুধের প্রকৃত দামের তুলনায় অনেক কম দামে নকল ওষুধগুলো বাজারে বিক্রি হচ্ছিল। তিনি বলেন, এগুলো মাদকের থেকেও ভয়ংকর। মানুষ অসুস্থ হয়ে ওষুধ খায়। আর নকল ওষুধ খেয়ে মানুষ সুস্থ না হয়ে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই চক্রটি প্রত্যন্ত অঞ্চলকে টার্গেট করে বহুল বিক্রিত ওষুধগুলো নকল করে বাজারজাত করছিল। এই নকলের বিষয়টি সাধারণ ক্রেতারা বুঝতে পারেন না। শুধু যারা ম্যানুফ্যাকচার করে তারাই বুঝতে পারে। সেজন্য ওষুধ প্রশাসনসহ আরো যারা আছেন তাদের সক্রিয় হয়ে এসব নকল ওষুধ প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। বংশাল থানার মামলায় গ্রেফতারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
অভিযান পরিচালনাকারী গোয়েন্দা পুলিশের কোতোয়ালি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. সাইফুর রহমান আজাদ বলেন, গ্রেফতারকৃত তরিকুল ইসলাম ও সৈয়দ আল মামুন কারখানা স্থাপন করে জীবনরক্ষাকারী এসব নকল ওষুধ তৈরি করেছে। সাইদুল ইসলাম নকল ওষুধ তৈরির প্রধান কারিগর, মনোয়ার অ্যালো ফয়েল ও আবদুল লতিফ ওষুধের পাতায় ছাপ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসহ সিলিন্ডার সরবরাহ করত। গ্রেফতারকৃত নাজমুল ঢালী ওষুধের বক্স তৈরি করে এ সব নকল ওষুধ গ্রেফতারকৃত সাগর আহমেদ মিলনের নেতৃত্বে মিটফোর্ডের কয়েকটি গ্রুপের মাধ্যমে বাজারজাত করত।
এসব ওষুধের ইনগ্রিয়েডেন্টসে মূলত প্রয়োজনীয় কোনো সক্রিয় উপাদান থাকে না। এছাড়া নিম্ন গ্রেডের মেইন স্টার্চ ব্যবহূত হয়। এমনকি স্টেরয়েড ও ডাই ব্যবহূত হতে পারে। নন ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রেডের এসব কেমিক্যাল সেবনের ফলে মানুষের কিডনি, লিভার, হূদযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এসব নকল ওষুধ সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদ।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববাজারে ১৪৫টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। ভেজাল ও নকল ওষুধ এই সুনাম এবং আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মফস্বলের ওষুধ ফার্মেসিগুলোকে টার্গেট করে একটি অসাধুচক্র সারা দেশে ভেজাল ও নকল ওষুধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যদি কেউ আমাদের নকল ওষুধ কারখানা সম্পর্কে অবগত করেন তাহলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
নকল ওষুধের ভয়াবহতা প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের চিকিত্সক ডা. জয় চৌধুরী বলেন, নকল ওষুধ ব্যবহারে হার্ট, লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া গর্ভবতী নারী ও তার সন্তানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিসহ মানবদেহের নানা ক্ষতি করতে পারে। নকল অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে পরবর্তীতে আসল অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে কাজ করে না। ফলে ঐ রোগীকে পরবর্তীতে চিকিত্সা করতে অনেক বেগ পেতে হয়।
এ ব্যাপারে জেনিথ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. বেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজারে যে ওষুধগুলো সব থেকে বেশি চলে সেগুলো নকল করে চক্রটি। প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো যেসব নীতিমালা ও প্রক্রিয়া মেনে ওষুধ তৈরি করে নকল প্রস্তুতকারকরা এর কিছুই মানে না।
নকল আর আসল ওষুধ চেনার উপায় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা এমনভাবে ওষুধ তৈরি করে যা সাধারণ ক্রেতাদের চেনার কোনো উপায় নেই। তবে প্রকৃত ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আসল আর নকল ওষুধের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারবে। ওষুধের প্যাকেটের সিকিউরিটি হোলোগ্রামও নকল করছে চক্রটি। তবে ট্যাবলেটের ক্ষেত্রে আসলটি অনেক শক্ত হয় এবং আর নকলটি সফট হয়। ওষুধের ভেতরে রঙেরও পার্থক্য হয়।
