কেপলার এর সূত্র

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:৫৬

মাধব রায়, কথাসাহিত্যিক

সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

 

সূর্যগ্রহণ দেখার পর দুপুরের খাবার খেয়ে একটু রেস্ট নেয়া হলো সবার। বিকেল পাঁচটার দিকে নীলকান্তবাবু বললেন এখন চল আমরা একটু হেঁটে আসি। সবাই এক কথায় রাজি।

কমলা বললেন, না না, এই করোনার মধ্যে দলবেঁধে হাঁটতে যাবার কোনও দরকার নেই। বাসায় বসে গল্প করো।

নীলকান্তবাবু বললেন, ঠিকই বলেছ। বাইরে না গেলেই ভালো।

রেখা বলল, আমার খুব খারাপ লাগছে। বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিল্পী করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

সীমা বলল, হ্যাঁ এন্ড্রু কিশোর আসলে সকল শ্রেণির এবং সব বয়সের মানুষের প্রিয় শিল্পী ছিলেন। সবার জন্য গান করতেন তিনি।

নীলকান্তবাবু বললেন, আসলেও। কয়েকদিন আগে আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী করোনায় মৃত্যুবরণ করলেন। এটিও আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি আমাদের পাশে থেকে পথ দেখিয়েছেন।

রেখা বলল, হ্যাঁ বাবা, পাকিস্তানি শাসকরা যখন এ অ লে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করেছিল, তখন এদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল, তখন কামাল লোহানী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর এই অবদান আমাদের মতো শিল্পীরা ভুলতে পারবে না।

নীলকান্তবাবু বললেন, কেউই ভুলতে পারবে না। এই সমস্ত মানুষ ক্ষণজন্মা। তিনি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীরও সভাপতি ছিলেন একসময়।

অণু বলল, মা কী যেন রান্না করছে, গন্ধ আসছে।

বিন্দু বলল, কাঁঠাল বীচি ভাজছে। আজকে বিকেলে চা এর সাথে হবে।

দারুণ গন্ধ আসছে, বললেন নীলকান্তবাবু।

সীমা বলল, এদিকে আবার পত্রিকা কী লিখেছে দেখো। করোনায় নাকি ঘ্রাণশক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ডাক্তাররা বলেছেন, করোনায় স্বাদও নষ্ট হতে পারে।

তাই নাকি!

হ্যাঁ, ফরাসি গবেষক প্যারিসের অ্যানসমিয়া সংস্থার প্রধান ড. মাইক্যাল মেইলার্ড বলেছেন প্যারিসের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগিরা করোনা থেকে সেরে উঠলেও ঘ্রাণশক্তি ফিরে পাননি। ডায়াবেটিস বা পার্কিনসন এর মতো রোগে আক্রান্তদের মধ্যে অনেক সময় এই সমস্যা দেখা দিত। এখন করোনায় আক্রান্তদেরও এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে।

এর মধ্যে একটা বড় বাটিতে করে অনেকগুলো ভাজা কাঁঠালের বীচি এনে দিলেন কমলা, আর কয়েকটা খালি পেট। সবাই বসে বসে খাও। আর ছোকলাগুলো এখানে ফেলো। ঘর নোংরা করবে না কেউ।

বিন্দু বলল, আমি নোংরা করি না।

অণু বলল-তুইই বেশি নোংরা করিস।

বিন্দু ভেংচি কাটল।

আকাশ কাঁঠালের বীচি খেতে খেতে বলল, আ”ছা মামা, আমরা যে সূর্যগ্রহণ দেখলাম, এর ভবিষ্যত্বাণী প্রথম করলেন থ্যালিস। কিন্‘ কখন চাঁদ, সূর্য, পৃথিবী একই সরলরেখায় আসবে, এটি কীভাবে জানা যাবে?

এটি আসলে কোন গ্রহটি সূর্যের চারদিকে কতদিনে ঘুরে, কিংবা কোন উপগ্রহটি গ্রহের চারদিকে কতদিনে ঘুরে এর ওপর নির্ভরশীল। এটি ডেনমার্কের জ্যোতির্বিদ জোহান্স কেপলার (Johanns Kepler) এর সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায়। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে কেপলার সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণায়মান গ্রহগুলোর গতিবিষয়ক তিনটি সূত্র প্রদান করেন। এগুলো গ্রহগতি সম্পর্কিত গতিসূত্র বলা হয়।

অণু বলল, আমরা তো জেনেছি নিউটনের গতিবিষয়ক সূত্র।

হ্যাঁ, নিউটনের গতিবিষয়ক সূত্র হচ্ছে বাহ্যিক বল প্রয়োগে বস্তুর গতি। কেপলার এর গতিবিষয়ক সূত্র হচ্ছে প্রাকৃতিক গতি, গ্রহণক্ষেত্রের গতি। গ্রিক জ্যোতির্বিদগণই সৌরজগত নিয়ে প্রথম চিন্তাভাবনা শুরু করেন। দার্শনিক টলেমি (Ptolemy) চিন্তাভাবনাগুলোকে তত্ত্ব আকারে উপস্থাপন করেন। তবে এতে কিছুটা ভুল ছিল। টলেমির মতবাদ ছিল, পৃথিবীই সৌরজগতের কেন্দ্র এবং চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, উপগ্রহগুলো সকলেই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জটিল কক্ষপথে আবর্তন করছে।

চন্দ্রা বলল-হ্যাঁ, এই তথ্য তো আমরা আগেই জেনেছি। টলেমির বিশ্ব হচ্ছে পৃথিবীকেন্দ্রিক। আর কোপার্নিকাস (Copernicus) এর মতে পৃথিবী একটি গ্রহ যা নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ঘূর্ণনরত এবং সূর্যের চারদিকে ঘুরছে।

ঠিকই বলেছিস, বললেন নীলকান্তবাবু। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত টলেমির মতবাদ কার্যকর ছিল। তখন এই তত্ত্ব বহু জ্যোতির্বিদের অনেকগুলো পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। ষোড়শ শতাব্দীতে কোপার্নিকাস বলেন, সূর্যকে স্থির হিসাবে বিবেচনা করলে আকাশের বস্তুসমূহের ঘূর্ণনের একটা সহজ ব্যাখ্যা দেয়া যায়। কোপার্নিকাস এর ব্যাখ্যায় অনেকে সন্তুষ্ট হন। কেউ কেউ আবার বিরোধিতা করেন। দুই তত্ত্বের বিরোধ জ্যোতির্বিদদের আরও বেশি বেশি পর্যবেক্ষণে আগ্রহী করে তোলে। জোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে (Tzcho Brahe) সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহের ঘূর্ণনের গতি সম্পর্কে পর্যবেক্ষণলব্দ ডাটা সংগ্রহ করেন, যার ওপর ভিত্তি করে কেপলার এই সূত্রগুলো লিপিবদ্ধ করতে সক্ষম হন। কেপলার টাইকো ব্রাহের সহকর্মী ছিলেন।

বিন্দু বলল, টলেমির মতে পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র। একে কেন্দ্র করে কী কী ঘুরছে?

নীলকান্তবাবু বললেন, পৃথিবীর পরে চাঁদ। এরপর বুধ, শুক্র, সূর্য, মঙ্গল এভাবে সৌরজগতের গ্রহনক্ষত্রগুলো আবর্তনরত। মঙ্গলের পর তাদের চিন্তা আর বিস্তৃত হয়নি। কেপলার মঙ্গলগ্রহ পর্যবেক্ষণে বিশেষ মনোযোগি হন। তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন, গ্রহগুলি সূর্যকে একটি ফোকাসে রেখে উপবৃত্তাকার পথে ভ্রমণ করে। ফলে এদের বেগ অনিয়মিত হয়ে থাকে।

ফোকাস মানে? সীমা বলল, আমরা তো লেন্স বা দর্পনের ফোকাস দেখেছি।

নীলকান্তবাবু বললেন, বৃত্তের থাকে কেন্দ্র, আর উপবৃত্তের ফোকাস না নাভি। দুটো ফোকাস থাকে। উপবৃত্তের দীর্ঘতম ব্যাসকে বলে পরাক্ষ বা মেজর এক্সিস। দুই ফোকাসের মধ্যদিয়ে গমনকারী অক্ষ হচ্ছে পরাক্ষ। কেপলার এর এই পর্যবেক্ষণ ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। একই বত্সর বুধ সম্পর্কেও তিনি একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে এই নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ‘Torti’ নামে। ১৬১৮ এবং ১৬২০-২১ সালে কেপলার তাঁর গ্রহ সম্পর্কিত নিয়মাবলি নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেন এবং এতে পর্যবেক্ষণ বৃহস্পতি পর্যন্ত সমপ্রসারিত করেন। বইটির নাম Epitome astronomiae copernicannae input এই বইতেই তিনি গাণিতিকভাবে সম্পর্কগুলো স্থাপন করেন।

কিন্তু সূত্রগুলো কী, তা তো বলছো না, বলল আকাশ।

বলছি- বললেন নীলকান্তবাবু। প্রথম সূত্র হলো, প্রতিটি গ্রহই সূর্যকে একটি ফোকাসে রেখে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরে। একে বলে কক্ষের সূত্র। দ্বিতীয় সূত্র হলো ক্ষেত্রফলের সূত্র। গ্রহ এবং সূর্যের সংযোজক সরলরেখা সমান সময়ে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রম করে।

মানে? চন্দ্র বলল।

            পরের অংশ আগামীকাল