ক্ষণজন্মা : আবদুল মান্নান সৈয়দকে নিয়ে টুকরো কথা

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:৫৬

 

আবদুল মান্নান সৈয়দ বিচিত্রতলস্পর্শী সর্বসত্তানিমগ্ন এক সাহিত্যিক! বাংলাসাহিত্যের সামগ্রিক অনুভবের এক বিস্তীর্ণ জলাশয় ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ—এই ত্রয়ী দিকপালকে যে-গভীরতায় তিনি পাঠ করেছেন তার সমকক্ষতা বিরল। বেগম রোকেয়া, শাহাদাত্ হোসেন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, ফররুখ আহমদ—এতজন সাহিত্যিক সম্পর্কে সামগ্র্যধর্মী বই রয়েছে তাঁর। এছাড়াও লিখেছেন বাংলাভাষার অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকের সম্পর্কে। আজ ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুদিন। কয়েকটি টুকরো কথায় তাঁকে স্মরণ করার প্রয়াস এই ঊনরচনাটি।

 

১.

আবদুল মান্নান সৈয়দের কাছে সাহিত্যিকতাই ছিল বড়। পলিটিক্সকে পলিটিক্স হিসাবে বোঝার ব্যাপারে তিনি সচেতন বা আগ্রহী ছিলেন না! স্বসমাজের সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁর সাহিত্যের অন্যতম প্রধান বিষয়! আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখাপত্র দীর্ঘকাল ধরে পড়ে এবং তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে অনুভব করেছি যে, সাহিত্যকে তিনি মোটা দাগে সমাজ ও ব্যক্তিসত্তার পরিপ্রেক্ষিতে ফেলে বিচার করে দেখতে পছন্দ করতেন। বিশ্বশিল্প ও বাংলা সাহিত্যের অনাচকানাচ পরিভ্রমণ করে তাঁর মধ্যে যে সাহিত্যবোধ ক্রমশ জায়মান হয়েছে তার আলোকেই লিখতেন তিনি! তাঁর কাছে সাহিত্যিক কারণই ছিল মুখ্য। কিন্তু দর্শন ও পলিটিক্সের বোধও যে তাঁর ছিল না তা নয়, বরং বলা যায় তাঁর এইসব বোধও সাহিত্যবোধের মধ্যেই ছিল দ্রবীভূত! বাংলাভাষার আধুনিক কালের মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের সম্পর্কে লেখালিখিও এই ধরনের দ্রবীভূত বোধের দ্বারাই প্ররোচিত।

 

২.

‘আধুনিকতা’ই সমসাময়িক বা ঈষদগ্রজদের মতো আবদুল মান্নান সৈয়দেরও আরদ্ধ ছিল, কিন্তু তা ছিল না কেবল অনুকারী কিছু। তাঁর আধুনিকতার বোধে পাশ্চাত্যপ্রভাবের প্রবলতা থাকলেও মোটের ওপর তা ছিল আঅতীত-ভবিষ্যপ্রসারিত ও আস্বসমাজ-বিশ্বপ্রবাহিত। তিনি সূত্র জানতেন অধিগ্রহণের। সামগ্রিকভাবে তাঁর সৃজনশীলতাকে যদি এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তত্ত্বায়িত করার চেষ্টা করা হয় তাহলেও এর উত্স পাওয়া যাবে।

 

৩.

তিনি বলেছিলেন, তিনি চলেন অন্তরাত্মার ডাক শুনে। কারণ কারো চলার পথ কী তা বিচার করতে পারে কেবলমাত্র তার অন্তরাত্মাই! তার পক্ষেই সম্ভব সঠিক নির্দেশনা খুঁজে নেয়া। তিনি মনে করতেন কারো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের ইতি ও নেতিকে তার নিজের পক্ষেই শুধুমাত্র সম্ভব বিচার করে দেখা। অন্যরা বিচারের আরও কিছু অনুষঙ্গই কেবল যোগ করতে পারে। তিনি বলতেন, শেষপর্যন্ত অন্তরাত্মা যদি পথপ্রদর্শক না হয়ে থাকে তাহলে কোথাও পৌঁছার সম্ভাবনা নেই!