বর্তমানে আমাদের সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তির বিস্তার, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিডিও গেমসের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি, নারী নির্যাতন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধপ্রবণতা, জঙ্গি তত্পরতা ইত্যাদি বাড়িয়া গিয়াছে। সংস্কৃতিসেবীরা মনে করেন, দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণের অভাবই এই দুঃসহ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। সাংস্কৃতিক জাগরণের ফলে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত হইয়াছিলাম; কিন্তু বর্তমানে স্বাধীন দেশে শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ নাই বলিলেই চলে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হইল, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করিলেও আমরা এতদিনেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিচর্চাকে উপজেলা পর্যন্ত সুপরিকল্পনা অনুযায়ী ছড়াইয়া দিতে পারি নাই। গড়িয়া তুলিতে পারি নাই এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় স্থাপনা ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শিল্পকলা একাডেমি। ইহার লক্ষ্য হইল—‘জাতীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারের মাধ্যমে সকল মানুষের জন্য শিল্প-সংস্কৃতির প্রবাহ তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি ঋদ্ধ সৃজনশীল মানবিক বাংলাদেশ গঠন।’ ইহার অন্যতম স্লোগান ‘৫৬ হাজার বর্গমাইলে শিল্প-সংস্কৃতির আলো’ ও ‘১৬ কোটি মানুষের জন্য শিল্প-সংস্কৃতি’; কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও স্লোগানের প্রতিফলন খুবই কম। কেননা ৬৪টি জেলায় শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম পরিচালিত হইলেও পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা নাই সব কয়টি জেলায়। অডিটরিয়ামসহ প্রশিক্ষণ ভবন রহিয়াছে ৪১টি জেলায়। সেখানে আবার স্থায়ী জনবলের ঘাটতি রহিয়াছে। জেলার বাহিরে ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত ছয়টি উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমি ভবন নির্মিত হয়। ইহার পর একাডেমির কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি প্রকল্পের আওতায় ১০টি উপজেলায় ৫০০ আসনের মুক্তমঞ্চসহ একতলাবিশিষ্ট প্রশিক্ষণ ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এইগুলির অবস্থাও ভালো নহে।
বলা হইতে পারে, যেইখানে জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলিই জনবল ও বাজেটের অভাবে প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিচালিত হইতেছে না, সেখানে উপজেলা পর্যায়ে কেন ইহার কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হইবে? তবে সংস্কৃতিসেবীরা চাহেন জেলা ও উপজেলা উভয় পর্যায়েই শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম গতিশীল ও প্রাণবন্ত হউক। নতুবা একাডেমির যে স্লোগান, সেই উদ্দেশ্য পূরণ হইবে না। আবার শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করিলেই চলিবে না, সেইগুলি কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য লোকবল দরকার। দরকার নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ করা। উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমির ভবনগুলি দেখভাল করিবার জন্য বত্সরে মাত্র ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এই অর্থ আবার উপজেলা প্রশাসনের দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান পরিচালনাতেই খরচ হইয়া যায়। তাহা হইলে স্থাপনাগুলি রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির অর্থ আসিবে কোথা হইতে? উপজেলা পর্যায়ে এই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন সহকারী সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা ও অন্তত একজন পিয়ন নিয়োগ দেওয়া কি উচিত নহে? ২০১৯ সালে ‘১০০ উপজেলায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ’ প্রকল্প জমা দেওয়া হইয়াছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে। ইহার মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সুবিধাসহ ৪০০ আসনবিশিষ্ট অডিটরিয়াম, উন্মুক্ত মঞ্চ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও লাইব্রেরি নির্মাণের কথা বলা হইয়াছে; কিন্তু এখনো ইহা অনুমোদিত হয় নাই। তবে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, ৩০টি উপজেলায় সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য সমীক্ষা শুরু হইয়াছে। আজ শিল্প-সংস্কৃতিচর্চায় যে স্থবিরতা তৈরি হইয়াছে, শিল্পীদের ভদ্রোচিত জীবন ধারণ কঠিন হইয়া পড়িয়াছে, তাহাতে সরকারিভাবে এমন সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব প্রধানত যে দায়ী তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
অবশ্য শিল্পকলা কার্যক্রমের এই দুর্দশা অন্যান্য প্রজেক্ট বা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হইলেও দেখা যায় পর্যাপ্ত লোকবল বা সরঞ্জামাদি নাই। এই প্রবণতা হইতে আমাদের অবশ্যই বাহির হইয়া আসিতে হইবে। এমন নহে যে, এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নে লক্ষ-হাজার কোটি টাকা খরচ হইবে। আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক উপজেলায় সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়িয়া তুলিতে পারি। যখন এই প্রকল্প গ্রহণ করা হইবে তখন হইতেই যেন লোকবল নিয়োগ প্রক্রিয়াও জোরদার করা হয়।
