দুই নেতার শিশুসুলভ বিতর্ক

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:২৩

বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এর প্রকোপ এখনো কমেনি। শুরু হয়েছে মহামারি আকারে ডেঙ্গু জ্বর। বন্যায় দেশ প্লাবিত। টেলিভিশনে বন্যার্ত মানুষের দুর্দশার ছবি, শিশুসন্তান কোলে নিয়ে গলা অব্দি পানির মধ্যে মায়ের বহু কষ্টে হাঁটাচলা দেখে দূর প্রবাসে বসেও মনের উদ্বেগ চেপে রাখতে পারি না। আর এই সময়ে দেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি এক অহেতুক বিতর্কে নেমেছে। প্রায় ৫০ বছর পর বিতর্ক তোলা হয়েছে—ঢাকার চন্দ্রিমার কবরে কার মৃতদেহ? জেনারেল জিয়াউর রহমানের না আর কারো? পাশাপাশি আরেকটি বিতর্ক শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের শেখ সেলিম ও জাসদ (ইনু) নেতা ইনুর মধ্যে। শেখ সেলিম বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে ইনুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে ইনু প্রশ্ন তুলেছেন, শেখ সেলিম ১৫ আগস্ট তার ভাই শেখ মনির এবং স্ত্রীর মৃতদেহ ফেলে রেখে আমেরিকান দুতাবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন কেন?

প্রশ্ন হলো, এগুলো কোনো অভিযোগ? এ ধরনের ছেলেমানুষি অভিযোগ নিয়ে দেশের দুজন দায়িত্বশীল নেতা জনগণের এই দুঃসময়ে বিতর্কে নামতে পারেন? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তার এক উক্তিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর খালেদ মোশাররফ আহত হলে কে সেক্টর কম্যান্ডার হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন, সে সম্পর্কেও অসাবধানতাবশত একটি ভুল তথ্য দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের উচিত এ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে সংশোধন করে দেওয়া। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের দায়িত্বই এটা। ৫০ বছর আগরে ঘটনা সম্পর্কে একটু জেনেশুনেই কথা  বলা ভালো।

গত শতকের গোড়ায় যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন সন্নিহিত সীমান্তে কিছু এলাকা তাদের বলে দাবি করেছিল। এই সীমান্ত এলাকা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছিল—এই এলাকা কার? সোভিয়েত ইউনিয়নের দাবি, এলাকাটি তাদের। জার্মানির দাবি, তাদের। লেনিন এই বিতর্ককে আখ্যা দিয়েছিলেন unfentile Foolishness বা শিশুসুলভ বোকামি। বাংলাদেশে এখন যে বিতর্ক চলছে, তাকে শিশুসুলভ হিংসুটেপনা আখ্যা দিলে কম বলা হয়।

প্রথমেই জিয়ার মৃতদেহের কথায় আসি। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়ার দেহ গুলিতে ঝাঁজরা করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর তার দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল অথবা অজ্ঞাত স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। তিন দিন পর তার যে মৃতদেহ ঢাকায় এনে চন্দ্রিমায় দাফন করা হয়, সেটি জিয়ার মৃতদেহ নয় বলে তখনই খবর রটেছিল। এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাননি। জিয়ার পরিবার-পরিজন ও তাদের সরকার এটিকে জিয়ার লাশ বলে মেনে নিয়েছে। এখানেই কিসসা খতম।

এখন যে প্রশ্ন উঠেছে তা হলো, জাতীয় সংসদ এলাকায় যেসব বিধিবহির্ভূত কবর দেওয়া হয়েছে, সরকার সেগুলো অপসারণ করতে চায়। সরকারের এটা নিজস্ব এক্তিয়ারের ব্যাপার। স্পেনের জাঁদরেল ডিকটেটর জেনারেল ফ্রাংকোর মৃতদেহ মাদ্রিদের সিটি সেন্টার থেকে তুলে অন্যত্র দাফন করা হয়েছিল। এরকম কবর স্থানান্তরের বহু দৃষ্টান্ত আছে। জাতীয় সংসদ এলাকা চন্দ্রিমা থেকে জিয়াউর রহমানের লাশও অন্যত্র সরানো যেতে পারে। এ ব্যাপারে বিএনপির আপত্তিতে সরকারের কর্ণপাত করার দরকার নেই।

কবর সরানো এক কথা আর কবরের ভেতরে কার লাশ আছে, তা নিয়ে বিতর্কে জড়ানো আরেক কথা। সরকার বিএনপির ট্র্যাপে পড়েছে। বিএনপির কাছে সরকারবিরোধী প্রচারণার কোনো ইস্যু ছিল না। জিয়ার মৃতদেহ নিয়ে অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে সরকার বিএনপিকে একটা ইস্যু সৃষ্টির সুযোগ করে দিল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই বিতর্কে জড়িয়েছেন। ঢাকার টকশোগুলোতে এখন এই বিতর্ক ছাড়া কোনো কথা নেই। প্রথমে পরীমনি ইস্যু নিয়ে মহাবিতর্ক। তারপর জিয়াউর রহমানের লাশ নিয়ে এই কুতর্ক। আর এই বিতর্কের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে মহামারি ও মহাপ্লাবনে মানুষের অসীম দুর্দশার কথা। সরকার যদি মনে করে থাকে তাতে তাদের সুবিধা হবে, তাহলে তারা ভুল করছে। এই শিশুসুলভ বিতর্কে লাভবান হবে বিএনপি।

সেলিম ও ইনু দুজনেই দেশের প্রবীণ রাজনীতিক এবং সাবেক মন্ত্রী। তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছেন, দুটিই হাস্যকর অভিযোগ। ইনু বঙ্গবন্ধুর হত্যা ষড়যন্ত্রে কোনোভাবে জড়িত ছিলেন তার কোনো প্রমাণ নেই। প্রমাণ থাকলে শেখ হাসিনা কিছুতেই তাকে মন্ত্রিসভায় নিতেন না। তার দলকেও মহাজোটে গ্রহণ করতেন না। ইনুর বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি আনন্দ প্রকাশ করার জন্য ঘাতকদের ব্যবহূত ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে নাচানাচি করেছিলেন।

এই অভিযোগ প্রমাণিত নয়। ট্যাংকে দাঁড়িয়ে নাচানাচি করার যে ছবি ইতিপূর্বে খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে, তা খুবই অস্পষ্ট। ছবিটি ইনুর কি না, তা বোঝা যায় না। ইনু এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হাসিনা সরকারে যোগ দেওয়ার পর ইনু বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন প্রধানমন্ত্রীকে তুষ্ট করার জন্য। খালেদা জিয়া ও বিএনপির তিনি যতটা সমালোচনা করেছেন, ততটা সমালোচনা আওয়ামী লীগের কোনো মন্ত্রীও করেননি। আ স ম আব্দুর রবের মতো তিনি তিন তিনবার ভোল পাল্টাননি। তার দল এখনো মহাজোটে রয়েছে। তাকে অকারণে শত্রুশিবিরে ঠেলে দেওয়া শেখ সেলিমের মতো একজন ঝানু নেতার উচিত নয়।

অন্যদিকে শেখ সেলিমের বিরুদ্ধে হাসানুল হক ইনুর অভিযোগ একেবারেই ছেলেমি অভিযোগ। সেলিম সেই ভয়ংকর রাতে ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন কি না, জানি না। যদি নিয়ে থাকেন, তাহলে আপত্তিটা কীসের? আমেরিকার রাষ্ট্রদূত বোস্টার যে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত, এটা তখন পর্যন্ত জানা যায়নি। জানা গেছে অনেক পরে। সেলিম নিরস্ত্রভাবে একা তার বড় ভাই মনি ও তার স্ত্রীকে রক্ষা করতে পারতেন না। নিজের প্রাণটা দিতেন। এই অবস্থায় পড়লে ইনুও তার বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ভুলে গিয়ে মার্কিন দূতাবাসে আশ্রয় নিতেন। মার্কিন দূতাবাসই তখন ছিল সবচাইতে নিরাপদ স্থান। সেলিম যদি সেই দূতাবাসে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে থাকেন, তাতে দোষের কী আছে? বরং সেলিম সংগত কাজই করেছিলেন। জাসদ তখনো ভাগ হয়নি। প্রশ্ন তোলা যায়, সেই রাতে আ স ম আব্দুর রব, সিরাজুল আলম খান—এসব বড় বড় বিপ্লবী নেতা কোথায় ছিলেন? একটি প্রতিবিপ্লবী চক্রান্ত ঠেকানোর পরিবর্তে তারা কি তাতে সাহায্য দেননি?

ইনুকে আমি ব্যক্তিগতভাবে দোষারোপ করি না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে তার কোনো ভূমিকা ছিল, তা-ও আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু তার দল জাসদের আজ ত্রিভঙ্গ অবস্থা কেন? বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে যদি জাসদের বিশ্বাস থাকত, তাহলে দলটি নেতৃত্বের কাড়াকাড়িতে এমন করে ভাঙত না। আমার ধারণা, বঙ্গবন্ধু হত্যার রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছিল জাসদ। তার সুযোগ নিয়েছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। জিয়ার মতো এক খলনায়ককে বিশ্বাস করে কর্নেল তাহের গিয়েছিলেন পিপলস আর্মি বা গণ সেনাবাহিনী গঠন করতে। জিয়াকে বন্দিদশা থেকে তিনিই মুক্ত করে এনেছিলেন। বিশ্বাসঘাতক জিয়া তার প্রতিদান দিয়েছেন কর্নেল তাহেরকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করে। জিয়া যে খোন্দকার মোশতাককে সামনে শিখণ্ডি খাড়া করে ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, সেই মোশতাককেও তিনি দুর্নীতির মামলা করে জেলে পাঠিয়েছিলেন। সিরাজুল আলম খান এত বড় তাত্ত্বিক, তিনি বুঝতে পারেননি, প্রতিবিপ্লবী শক্তি কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলার কাজে তাকে এবং তার দলকে ব্যবহার করেছে।

ইত্তেফাকে ৫০ বছরেরও আগে মোসাফির তার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে লিখেছিলেন, ‘অতিবিপ্লবীরা সব দেশেই বিপ্লবের ক্ষতি করা ছাড়া তাকে সাহায্য জোগায়নি।’ বাংলাদেশে জাতীয় মুক্তির একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সদ্যমুক্ত দেশটিতে তখন গণতান্ত্রিক শাসনের কাঠামোই তৈরি হয়নি। সামন্তবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা তখনো সমাজদেহে প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছে। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি সিভিল ব্যুরোক্রেসি ও মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি দেশে ছিল না। বঙ্গবন্ধু তার ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিশমার প্রভাব খাটিয়ে দেশটিতে প্রথমে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ, সেই লক্ষ্যেই তিনি বাকশাল গঠন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ এড়াতে চেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, তিনি বিশাল জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিত্বের জোরে বাংলাদেশের জন্য নতুন সমাজ ও নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবেন। এ ব্যাপারে আলজিয়াস সম্মেলনে ফিদেল কাস্ত্রো তাকে সাবধান করেছিলেন। বলেছিলেন, আপনার সঙ্গে একটি বিপ্লবী সেনাবাহিনী না থাকলে আপনি পাকিস্তানি মনা কলোনিয়াল চরিত্রের সেনাবাহিনী সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের পথে এগোতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, দেশের জনগণ তাকে ভালোবাসে। এই জনগণের ভালোবাসা আর সমর্থন নিয়ে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে তার দ্বিতীয় বিপ্লব সমাপ্ত করতে পারবেন।

বঙ্গবন্ধু তা পারতেন, কিন্তু তার পরিকল্পনায় সবচাইতে বড় সাবোট্যাজ করেছে জাসদ (অবিভক্ত)। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে তারা দেশের যুবসমাজকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করেছে। ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা ভোল পালটে আশ্রয় নিয়েছে জাসদে। দুর্নীতির দায়ে আওয়ামী শ্রমিক লীগ থেকে বহিষ্কৃত নেতারা জাসদে যোগ দিয়ে রাতারাতি ‘সংগ্রামী নেতা’ হয়েছে। দেশে সন্ত্রাসের রাজনীতিও প্রথম শুরু করে জাসদ—দিনে-দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে। দেশের রাজনীতি প্রথম অস্থিতিশীল করে তোলে জাসদ। পরে দেশি ও বিদেশি প্রতিবিপ্লবী শক্তি এসে তার সুযোগ নিয়েছে।

দীর্ঘকাল পর অবিভক্ত জাসদের ভূমিকা নিয়ে কিছু আলোচনা করলাম। হাসানুল হক ইনু আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার কথা, যে ইস্যু নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম ও জাসদ (বিভক্ত) নেতা ইনুর মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা অত্যন্ত শিশুসুলভ বিতর্ক। এই বিতর্ক পরিহার করে দুই নেতারই উচিত আফগানিস্তানে তালেবান-শাসন প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের তালেবানপন্থিরা যাতে আবার মাথা তোলার উত্সাহ না পায় সেদিকে লক্ষ রাখা এবং সমাজদেহ থেকে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য এগিয়ে আসা। নইলে দেশে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা দূরের কথা, গণতন্ত্রই রক্ষা করা যাবে না।

 [ লন্ডন ৪ সেপ্টেম্বর, শনিবার, ২০২১ ]