বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দাপদাহ, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাসসহ নিত্যনতুন দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ববাসী। বায়ুমণ্ডলের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা জীবনযাপন কঠিন করে তুলছে প্রতিনিয়ত। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিক ব্যবহার এই সংকটকে তীব্র করে তুলছে। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের প্রভাবে সবুজায়ন হ্রাস করে অধিক দালানকাঠামো, অপরিকল্পিত শহর ও শিল্পকারখান স্থাপন করছে মানুষ। মানুষের এসব আগ্রাসী কর্মকাণ্ড বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্যাস বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করছে। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশও এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। উল্লেখিত কারণে গ্রামাঞ্চলে যেমন ফসল উত্পাদন কমেছে, তেমনি শহরাঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে তাপদ্বীপ প্রভাব (Urban Heat Island Effect) সৃষ্টি করছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে বাসযোগ্য শহর ও খাদ্যসংকট দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে নগর কৃষি।
নগর কৃষি বলতে অনেকে ছাদকৃষিকে বোঝালেও এটি আসলে শুধু ছাদকৃষিকেই বোঝায় না, বরং নগরকৃষির ধারণাটি আরো বিস্তৃত। নগরকৃষি বলতে বাসাবাড়ির ছাদ-বারান্দা ছাড়াও স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, ব্যাংক, শপিংমল, কনভেনশন সেন্টার ইত্যাদির প্রাঙ্গণসহ শহরের অন্যান্য অব্যবহূত পরিত্যক্ত খালি ও উন্মুক্ত বা আবদ্ধ জায়গায় বৃক্ষাদিসহ প্রয়োজনীয় শাক-সবজির কৃষি সম্প্রসারণ করাকে বোঝায়। নগরকৃষির বিস্তৃতি ঘটাতে পারলে শহরে খাদ্য সংস্থানের সঙ্গে সবুজের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে, যা এই সময়ে খুবই প্রয়োজনীয়। পরিবেশের প্রয়োজনে কোনো দেশ বা অঞ্চলের আয়তনের ২৫ শতাংশ গাছপালা থাকার কথা থাকলেও আমাদের দেশে তা ১৭ শতাংশের কম। আর শহরাঞ্চলে তা আরো কম।
এ ছাড়া বিল্ডিং কোডে ২০ শতাংশ সবুজ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনুপস্থিত এবং এই অনুশাসন মানার ও তদারকিতে কারো তত্পরতা দেখা যায় না। ঢাকা শহরের সবুজ নিয়ে গবেষণা করা জাপানি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জন গবেষকের মতে, ১৯৯৫ সালে ঢাকার সবুজ অঞ্চল ছিল ১২ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮ শতাংশ এবং বর্তমানে ৬-৭ শতাংশের বেশি নয়। অথচ একটি গাছ প্রকৃতিতে এক বছরে ১০টি এসির সমপরিমাণ শীতলতা দেয়, ৭৫০ গ্যালন বৃষ্টির পানি শোষণ করে, ৬০ পাউন্ড ক্ষতিকর গ্যাস বাতাস থেকে শুষে নেয়। এক হেক্টর সবুজ ভূমির উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ চলাকালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯০০ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং ৬৫০ কেজি বিশুদ্ধ অক্সিজেন প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়। জলবায়ুর সংকট মোকাবিলায় তাই শহরে সবুজের পরিমাণ বৃদ্ধির বিকল্প নেই, যা এখন সহজে সম্প্রসারিত করা যায় নগরকৃষির মাধ্যমে।
পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি নগরকৃষি খাদ্যের জোগান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু-সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট তীব্র হচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে শতভাগ খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে হবে (সূত্র :কৃষি তথ্য সার্ভিস)। ঢাকা শহরের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৯ হাজার মানুষ বসবাস করে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ সময়ের সঙ্গে খাদ্যসংকটকে প্রকট করে তুলবে। নগরবাসীর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে তাই যথাযথ নিয়ম মেনে, পরিকল্পিতভাবে নগরকৃষির ওপর গুরুত্বারোপ জরুরি হয়ে পড়েছে। ঢাকা শহরে প্রায় ১০ লাখ ছাদ রয়েছে। এসব ছাদ-ব্যালকনি-বারান্ধাসহ অন্যান্য জায়গায় ফুল-ফলের পাশাপাশি সব ধরনের শাকসবজি চাষাবাদ করা সম্ভব, যার মধ্যে মৌসুমি বিভিন্ন শাক-সবজি যেমন :টম্যাটো, বেগুন, ঢ্যাঁরশ, কুমড়া শসা, লাউ, পুদিনা, কাঁচা মরিচ, ক্যাপসিক্যাম ইত্যাদি এবং ফলমূল যেমন :কমলা, লেবু, আম, আমড়া, জাম, লটকন, পেয়ারা, কামরাঙা, লিচু, আনার, ডালিম, ডুমুর ইত্যাদি সহজে চাষাবাদ করা যায়।
নগরকৃষি চাষাবাদে তুলনামূলক খরচ কম। কেননা, এখানে বিভিন্ন জৈব ও সবুজ সারের ব্যবহার বেশি। এই পদ্ধতিতে পানির অপচয় স্বল্প। একই সঙ্গে এটি পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিও অনেকটা কমিয়ে আনে। বাইরে থেকে কিনে আনা শাক-সবজি আর ফলমূলে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিকের উপস্থিতি বিদ্যমান। বাজারে এসব কৃষিপণ্যের দামও চড়া। তাই নিজেরা চাষাবাদের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের সঙ্গে আর্থিক সাশ্রয়ও হয়। আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত উত্পাদিত ফসল অন্য কারো কাছে বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব। সর্বোপরি নগরকৃষির মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য বিশুদ্ধ বাতাস, বাস্তু সংস্থানের উন্নয়ন, খাদ্য, ওষুধ ইত্যাদির নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা সম্ভব। নগরের ভারসাম্য ও বিল্ডিংগুলোর সক্ষমতা যাচাই সাপেক্ষে পরিবেশ ও অর্থনীতিতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ নগরকৃষি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ুক।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
