কক্সবাজারে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে মারা হচ্ছে হাতি

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৩৫

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসতি গড়তে ধ্বংস হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার একর বন। এতে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে হাতি চলাচলের উখিয়া-ঘুমধুম করিডর। এছাড়া পাহাড়ি অরণ্যে নানা স্থাপনা নির্মাণের কারণে পাহাড়ে হাতির বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসছে। এ অবস্থায় ৬৩টি এশিয়ান হাতি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে বলে দাবি করেছেন কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. হুমায়ূন কবির। এসব কারণে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে হাতির পাল। অন্যদিকে হাতির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় জমিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে হাতি হত্যা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ বন বিভাগের তথ্যমতে, গেল চার বছরে ৯টি হাতির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি হাতি বৈদ্যুতিক ফাঁদ দিয়ে হত্যার প্রমাণ মিলেছে। গত ৩১ আগস্টও একটি মাদি হাতিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে উখিয়া-টেকনাফ-রামুর বনাঞ্চলে এখন ৬৩টি হাতি রয়েছে, যেখানে শিশু হাতির সংখ্যা ১০-১২টি।

ডিএফও মো. হুমায়ূন কবির বলেন, হাতি দল বেঁধে  নিজস্ব করিডর দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া-আসা করে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দুটি করিডর হঠাত্ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলাচলে বাধা পেয়ে প্রায়ই লোকালয়ে হানা দেয় বন্য হাতির পাল। এতে ক্ষতি হচ্ছে ফসলের। মানুষ             -হাতির দ্বন্দ্ব বেড়েই চলেছে দিনদিন। বাড়ছে হাতি হত্যার ঘটনা। বনভূমি পুনরুদ্ধারে বন বিভাগ ব্যাপকভাবে বনায়নের মাধ্যমে হাতির আবাসস্থলের উন্নয়নে চেষ্টা চলমান রাখলেও এর সুফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

কক্সবাজারে বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলদের মতে, রোহিঙ্গা আসার পরে আবাসস্থল হারিয়েছে দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় থাকা হাতিগুলো। আবাসস্থলের পাশাপাশি চরম খাদ্যসংকটের কারণে লোকালয়ে চলে আসছে হাতি। হাতি রক্ষায় প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ধোয়াপালং রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন  বলেন, বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকার পাদদেশ ও আশপাশে জোত (খতিয়ানভুক্ত) জমি রয়েছে। এখানে চাষ করা ফসলে হাতির পাল হানা দেয়। ফসলে হাতির হানা রোধে অনেকে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতে। বন্য প্রাণির চলাচল রোধে এভাবে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা বেআইনি। এর কঠিন শাস্তি রয়েছে। এর পরও বন্যপ্রাণী হত্যার  গোপন তত্পরতা চালাচ্ছে দুর্বৃত্তরা।

রেঞ্জার সাজ্জাদ আরো বলেন, হাতি হত্যা বন্ধে চিহ্নিত এলাকায় ২৫ হাজার লিফলেট বিতরণসহ নানা তত্পরতা চালানো হয়। তার পরও কিছু অসাধু লোক হাতির প্রতি নৃশংসতা বন্ধ করেনি। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।

রেঞ্জ কর্মকর্তা সাজ্জাদ আরো বলেন, ‘গত ৩১ আগস্ট বৈদ্যুতিক ফাঁদে মাদি হাতিটিকে হত্যার পর নৃশংসভাবে খণ্ডবিখণ্ড করা হয়েছে। এ ঘটনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে বাদী হয়ে একটি মামলা আদালতে এবং অপর মামলাটি থানায় রুজু করেছি। জমির মালিক নজির আহমদকে ধরার পর হাতি হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।’

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণয় চাকমা বলেন, বনের ভেতরে মানুষের আবাস বাড়ায় বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য নষ্ট হয়েছে। হাতির প্রতি অত্যাচার বন্ধে জনপ্রতিনিধিদের সজাগ থাকার অনুরোধ জানান তিনি। 

খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মাবুদ বলেন, ‘নিরীহ বন্যপ্রাণী হত্যা কোনোমতে মানা যায় না। পাহাড়বেষ্টিত ইউনিয়নগুলোতে হাতিসহ বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছি।’ কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. হুমায়ুন কবির বলেন, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের হাতির উপদ্রব এলাকায় অসংখ্য সভা, মাইকিং, লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি ইতিমধ্যে ১৬টি ইআরটি (এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম) গঠন ও প্রশিক্ষণ প্রদান করাসহ আরো ২০টি ইআরটি গঠনের কার্যক্রম চলমান আছে। পাহাড়ের এসব এলাকায় দেওয়া বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্নকরণে ব্যবস্থা নিতে পল্লী বিদ্যুত্ কর্তৃপক্ষকে আবেদন জানানো হয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে লিখিত জানানো হচ্ছে। এত হতাশার মাঝে আনন্দের বিষয় হলো, গত বছর দেড়েক ধরে দক্ষিণ বন বিভাগে হাতির পালের সঙ্গে বাচ্চা হাতির দেখা মিলছে।