আম্বিয়া বেগম (৩২), স্বামী আব্দুল্লাহ দিনমজুর। খুলনার দাকোপের পানখালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীখোলা গ্রামের এই নারী আর্থিক সংকটে চিকিত্সকের কাছে যেতে পারেননি। কীভাবে গর্ভের সন্তানের সেবাযত্ন করবেন তা-ও জানতেন না। হঠাত্ করেই ইউএসএআইডির অর্থায়নে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ বাস্তবায়িত ‘নবযাত্রা’ প্রকল্পের কর্মীরা তার হাতে পরিয়ে দেন ‘কোয়েল’। ‘কোয়েল’ (কার্বন মনোক্সাইড এক্সপোজার লিমিটার) হলো হাতে পরিধানযোগ্য একধরনের স্মার্ট চুড়ি, যা অন্তঃসত্ত্বা নারীর আগে থেকে রেকর্ড করা অডিও স্বাস্থ্যবার্তা প্রদান করে। প্রতি সপ্তাহের রবিবার ঐ ‘কোয়েল’ আম্বিয়াকে স্থাস্থ্যবার্তা প্রদান করেছে। সেই বার্তা অনুসরণ করে চলতেন তিনি। একসময় ঐ ‘কোয়েল’ই হয়ে ওঠে আম্বিয়ার ‘চিকিত্সক’। এসব বার্তা মেনেই সুস্থ ও স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করেছেন আম্বিয়া। আম্বিয়া জানান, ‘কোয়েল’ গর্ভবতী মায়েদের ভালো বন্ধু। খুবই উপকারী এবং কার্যকর একটি যন্ত্র। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শুনেছি নবযাত্রা প্রকল্প শেষ হলে ‘কোয়েল’ও হয়তো থাকবে না। কিন্তু আমাদের মতো প্রান্তিক গর্ভবতী মায়ের কাছে ‘কোয়েল’ই সুস্থাস্থ্যের একমাত্র ভরসা। শুধু আম্বিয়া নন, এমন প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার গর্ভবতী নারীকে সুস্থাস্থ্যের বার্তা প্রদান করেছে ‘কোয়েল’।
জানা গেছে, যেসব গর্ভবতী নারীর মোবাইলফোন ছিল না, তাদের ‘কোয়েল’ প্রদান করা হয়। আর যাদের মোবাইলফোন ছিল, তাদের মোবাইলে ‘মামা’ মেসেজ দেওয়া হতো। ‘মামা’ (মোবাইল অ্যালায়েন্স ফর ম্যাটার্নাল অ্যাকশন) হলো গর্ভবতী ও স্তনদানকারী নারী এবং তাদের পরিবারের প্রভাবশালীদের কাছে স্বাস্থ্যসচেতন করতে দেওয়া মোবাইল বার্তা।
ধোঁয়ায় ক্ষতিকর গ্যাস থাকলে তা চিহ্নিত করে সতর্ক করে দেয় ‘কোয়েল’। এই যন্ত্র নারীদের কাছে হস্তান্তর করার আগে ১০ মাসের জন্য চার্জ দেওয়া হয়। এটি পানিতেও নষ্ট হয় না। গর্ভবতী নারীদের সুস্বাস্থ্য বার্তা পাঠানোর জন্য গ্রামীণ ইন্টেল নিয়ে এসেছে এই স্মার্ট চুড়ি। ‘কোয়েলে’ সংযুক্ত স্পিকারে প্রায় ৮০টি বার্তা শোনা যায়। এই বার্তাগুলো বাংলা ভাষায় আগে থেকেই রেকর্ড করা থাকে। উচ্চমানের শক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এই বিশেষ চুড়ি। সাধারণত এটি গর্ভবতী মায়ের শেষ মাসিকের তারিখ এবং সন্তান জন্মের তারিখ ঠিক রেখে সময়োপযোগী বার্তা পাঠায়।
আম্বিয়াসহ ‘কোয়েলে’ বার্তা গ্রহণকারী গর্ভবতীরা ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে জানান, প্রতি রবিবার সন্ধ্যায় ‘কোয়েল’ চুড়ির মাধ্যমে তারা বার্তা পেতেন। বার্তা আসার আগে মোবাইলের রিংয়ের মতো অ্যালার্ম বাজত ‘কোয়েলে’। তারপর সংশ্লিষ্ট বাটনে চাপ দিয়ে বার্তা শুনতেন তারা। পরবর্তী সময়ে ঐ বার্তা অনুসরণ করতেন।
সম্প্রতি দাকোপের পানখালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীখোলা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে কথা হয় নবযাত্রা প্রকল্প থেকে সহযোগিতা পাওয়া গর্ভবতী নারীদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে রীনা বেগম (২৩) বলেন, ‘জরিপের মাধ্যমে আমাদের নির্বাচন করা হয়। প্রতি সপ্তাহে উঠানবৈঠকে আমাদের নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়া হতো। তার মতে, আট মাস গর্ভবতী থাকাকালীন প্রতি মাসে ২ হাজার ২৪০ টাকা পেয়েছি। পরবর্তী ১৫ মাস পর্যন্তও ঐ টাকা পেয়েছি। প্রতি মাসে নিজের ও সন্তানের পেছনে ঐ টাকা খরচ করেছি।’ আরেক গর্ভবতী রীমা বলেন, ‘নবযাত্রা না থাকলে আমরা সেবাবঞ্চিত হব।’
