জিয়া মুক্তিযোদ্ধা হলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেননি কেন :আইনমন্ত্রী

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৪৮

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে ‘খুনি’ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, জিয়াউর রহমান প্রকৃতই মুক্তিযোদ্ধা হলে দায়মুক্তি অধ্যাদেশ (ইনডেমনিটি) বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের উদ্যোগ কেন নেননি? গতকাল শনিবার সংসদে ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ বিল-২০২১’ পাশের প্রক্রিয়ায় সামরিক আমলের জারি করা অধ্যাদেশগুলো রহিত করে নতুন করে আইন প্রণয়নের বিষয়ে আইনমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরলে তাতে আপত্তি করেন বিএনপি দলীয় এমপি হারুনুর রশীদ। তার আপত্তির জবাব দিতে গিয়ে আইনমন্ত্রী এ প্রশ্ন রাখেন।

বিএনপির প্রতি প্রশ্ন রেখে আনিসুল হক বলেন, ‘যদি খুনি জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা হতেন, কেউ কি তার হাতটা চেপে ধরেছিল যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করা যাবে না? কেউ কি তার হাতটা চেপে ধরেছিল যে ২৬ সেপ্টেম্বর যেই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স পাশ করা হয়েছে, এই অর্ডিন্যান্স বাতিল করা যাবে না? এইরকম তো কেউ করেনি। উনি এই বিচারটা করলেন না কেন?’

আইনমন্ত্রী বলেন, এই সংবিধান বলেন, আর সংবিধান যদি নাও ধরেন এটা জনগণের সিআরপিসিতে অধিকার- কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউরে অধিকার, যে একটা হত্যাকাণ্ড যদি সংঘটিত হয় বা একটা অপরাধ যদি সংঘটিত হয় সে থানায় গিয়ে একটা এজাহার দায়ের করতে পারে। সেই অধিকারটুকুও হরণ করে নিয়েছিলেন, ২১ বছর এটাও কারেক্ট করেননি। আর আজকে আপনি বিএনপির সংসদ সদস্য হয়ে বলছেন যে, এই তর্কবিতর্ক বন্ধ হোক।

‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স এন্ড বার কাউন্সিল বিল-২০২১’ পাশের প্রক্রিয়ায় বিএনপির এমপি হারুন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলমান বিতর্ক বন্ধ হওয়া উচিত’। জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, তর্কবিতর্ক কীভাবে বন্ধ হবে? যতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা (বিএনপি) জাতির পিতাকে জাতির পিতা হিসেবে গ্রহণ করবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত এই বিতর্ক চলবে। বিতর্ক চলবেই যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশকে পাকিস্তান করার যে উদ্দেশ্য ছিল বিএনপির, সেটা যতক্ষণ পর্যন্ত ধুয়ে-মুছে শেষ না হয়ে যাবে—ততক্ষণ পর্যন্ত এই রাজনীতি চলবে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা মানুক বা না মানুক, তাতে কিছু আসে যায় না। কারণ তিনি যে বাঙালি জাতির পিতা সেটা এই জাতি জানে এবং সেটা চিরদিন সংরক্ষিত রাখবে।  

হারুনের উদ্দেশে আনিসুল হক বলেন, উনি বললেন প্রধানমন্ত্রী জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় ১৫ আগস্টের ঘটনার ব্যাপারে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী সেখানে বলেছেন, ‘সেদিন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ কোথায় ছিল।’ মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী এই                সত্ সাহস দেখিয়েছেন। তিনি এটার প্রশ্ন তুলেছেন তার মানে তিনি এটা কগনিজেন্সে নিয়েছেন। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেছেন, বিএনপির ব্যাপারে যেটা বলেছেন সেটা যদি সত্য হতো তা হলে আমরা খুশি হতাম।

আইনমন্ত্রী বলেন, দুঃখের কথা কী বলব! সেদিন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক, তিনি বিএনপি সমর্থিত একজন ভালো ক্যাডার, তিনি উল্লেখ করেছেন—কালুরঘাটে সেদিন যদি খুনি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিতেন এবং সেদিন যদি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ওপর গুলি না চালাতেন তাহলে স্বাধীনতা কোথায় থাকত? ইতিহাস নাকি অন্যরকম হতো। আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছি, সেখানে যারা এরকম মিথ্যা বলার ধৃষ্টতা দেখায়, তাদের কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে কেউ মনে করে? উনার (হারুনের) বক্তব্য মানে বিএনপির বক্তব্য যে জাতিকে ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে, এটা সেটারই প্রতিফলন।

‘আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না’ বিধান বহাল রেখেই সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ বিল পাশ

সীমানা নির্ধারণ প্রশ্নে ইসির সিদ্ধান্তের বিষয়ে দেশের কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না— এমন বিধান বহাল রেখেই গতকাল সংসদে ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ বিল-২০২১’ পাশ হয়েছে।  আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিলটি সংসদে পাশের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিলের ওপর সংসদ সদস্যদের দেওয়া জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিষ্পত্তি করেন। গত ৩ জুলাই বিলটি সংসদে তুলেছিলেন আইনমন্ত্রী। তখন তা পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত আকারেই বিলটি সংসদে পাশের সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি।

পাশ হওয়া বিলের ৭ নম্বর ধারায় ‘ইসির সীমানা নির্ধারণ নিয়ে দেশের কোনো আদালত বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন তোলা যাবে না’ বিধানটি বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া বিলে বলা হয়েছে, দৈব-দুর্বিপাকে কোনো সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ করতে না পারলে আগের নির্বাচনে যেভাবে হয়েছে, সেই সীমানার ভিত্তিতেই নির্বাচন আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন।

বিলটি পাশের ফলে ১৯৭৬ সালের ‘দ্য ডিলিমিটেশন অব কন্সটিটিউয়েন্সিস অর্ডিনেন্স’ রহিত হবে। পাশকৃত বিলে নির্বাচন কমিশনকে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা বিদ্যমান আইনে ছিল না। বিলটি উত্থাপনের সময় আইনমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছেন, সংসদের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবং বাংলায় আইন করতেই মূলত বিলটি আনা হয়।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ১১৯(গ) অনুচ্ছেদে ইসিকে সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। আবার ১২৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ আইনের দ্বারা নির্বাচনি এলাকার সীমা নির্ধারণ’ করবে ইসি। এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘সংসদ নির্বাচন এলাকা সীমানা নির্ধারণ বিধান অধ্যাদেশ-১৯৭৬’ জারি করা হয়েছিল। এরপর থেকে ঐ অধ্যাদেশের বলে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস হয়ে আসছে।

বিলটি জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবের সময় বিএনপির হারুনুর রশীদ বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে আইনমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। পরে জবাব দিতে গিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘তারা একশটা খারাপ কাজ করবে, আমরা বলতে পারব না। এখন থেকে ৫০০ বছর পর কোনো সংসদ সদস্য যেন আইনটি কেন করা হয়েছে, সেটা জানতে পারে, সেজন্য এখানে ইতিহাসটা রাখা আছে।’

জাতীয় পার্টির (জাপা) ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, মানুষ এখন ভোট দিতে যাচ্ছে না। মানুষ যদি ভোটকেন্দ্রে না যায় তাহলে ইলেকশন কমিশন বা এই আইন দিয়ে কী হবে? ইলেকশন কমিশনের এত ক্ষমতা, কিন্তু মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী না কেন? দেশে ‘গণতন্ত্রবিহীন’ অবস্থা চলছে দাবি করে জাপার এই এমপি বলেন, সরকারি দল ক্ষমতাশালী হচ্ছে। বিরোধী দল দুর্বল হচ্ছে। সংবিধানে ভালো ভালো কথা আনলে হয় না, চর্চা করতে হয়।

ভোট না হলে বার কাউন্সিলের অ্যাডহক কমিটি গঠনের সুযোগ তৈরি করে বিল পাশ

মহামারি, দৈব দুর্বিপাক অথবা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন করা না গেলে অ্যাডহক কমিটি গঠনের সুযোগ তৈরি করে বিদ্যমান আইন সংশোধনে গতকাল সংসদে ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২১’ পাশ হয়েছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিলটি পাশের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।

১৯৭২ সালের এ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বিলটি পাশ করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না করতে পারায় বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করে গত ২৮ জুলাই একটি অধ্যাদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। অধ্যাদেশ জারির পর সংসদের প্রথম বৈঠকেই তা উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বৃহস্পতিবার অধ্যাদেশটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী। অধ্যাদেশের বিধানগুলো বিদ্যমান আইনে সংযোজন করতেই বিল পাশ করা হয়েছে।

পাশকৃত বিলে বলা হয়েছে—মহামারি, দৈব দুর্বিপাক অথবা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বার কাউন্সিলের নির্বাচন করা না গেলে সরকার একটি ১৫ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করবে। এই কমিটির প্রধান হবেন অ্যাটর্নি জেনারেল। অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। এই কমিটির মেয়াদ বাড়বে না বলেও বিলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ মার্চ বার কাউন্সিল নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয়েছিল। তপশিল অনুযায়ী গত ২৫ মে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় জরুরি সভা করে গত ৩ এপ্রিল বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন স্থগিত করা হয়।

‘পরীমনির বিষয়ে তিনি কেন বেশি আগ্রহী জানি না’

সরকারি দলের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘তিনি (হারুন) কী কারণে যেন পরীমনির বিষয়ে বড় বেশি আগ্রহী। আমি জানি না, তার বাসায় কী অবস্থা। এর আগেও তিনি পরীমনির বিষয়ে সংসদে কথা বলেছিলেন। শুক্রবারও সুযোগ পেয়ে পরীমনির বিষয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন।’

পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে হুইপ স্বপন শুক্রবার সংসদের দেওয়া বিএনপির এমপি হারুনের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘হারুনুর রশীদ অপ্রাসঙ্গিকভাবে পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে বেশকিছু আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে সত্যের প্রচুর অপলাপ রয়েছে। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মদ, জুয়া, হাউজি, রেসকোর্স আইন করে বন্ধ করেছিলেন। কিন্তু শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জিয়াউর রহমান বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম বলে বাংলাদেশে মদ, জুয়া, হাউজি সবকিছু জায়েজ করে দিয়েছেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশে মদ, জুয়া, হাউজি বন্ধ করা খুব দুরূহ হয়ে পড়েছে।’

অধিবেশনের মেয়াদ বেড়েছে

সংসদের চলমান চতুর্দশ অধিবেশনের মেয়াদ বেড়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া অধিবেশন চার কার্যদিবস চলার কথা ছিল। সে হিসেবে গতকাল সংসদের বৈঠক শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু গতকাল স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা পর্যন্ত সংসদের বৈঠক মুলতুবি করেন।