জান-ই-আলম
তখন মাঝরাত। ড্রেসিংরুম থেকে দর্শকদের বেড়াজাল ঠেলে সংবাদ সম্মেলনে আসতে পারছিলেন না তামিম ইকবাল। অনেকের সেলফি-ছবি তোলার ইচ্ছাপূরণ শেষে মিনিট পনের কথা বলেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে। মাঠে এসেই দেখলেন, খাবার চুরির অভিযোগে এক লোককে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিসিবির নিরাপত্তা কর্মীরা। তামিম দৌড়ে গিয়ে তাদের থামালেন। খাবার চুরি করা লোকটাকে ছেড়ে দিতে বললেন।
তারপরই মিরপুর স্টেডিয়ামের গ্রাউন্ডসম্যানরা ঘিরে ধরল তাকে। যাদের কাছে জাতীয় দলের যেকোনো ক্রিকেটারের চেয়ে তামিমের সম্মান বেশি। কেননা যখনই মিরপুরের উইকেট দুইহাত ভরে দিয়েছে এই ওপেনারকে। তখনই গ্রাউন্ডসম্যানদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন তিনি। ক্যারিয়ার জুড়ে বহুবার অনুশীলনে ক্যাচ ধরার আড়ালেও তাদেরকে সহযোগিতা করেছেন তামিম।
শেরেবাংলার শুক্রবার অতি মানবীয় ইনিংস খেলার পর রাতের বাকি সময়টুকুও স্বপ্নীল ঘোরের মাঝেই কেটেছে এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের। প্রথম বিপিএল শিরোপা বলে কথা। রাত পেরিয়ে সকালের ঝলমলে রোদ্দুর খেলা করছে আকাশে। তখনও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের ট্রফির আনন্দ বিলীন হয়নি। ট্রফির আমেজ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছে দলটা। গোটা রাত এমনকি সকালটাও টিম হোটেলে তামিমের রুমেই কাটিয়েছেন বিপিএলে দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতা দলের সদস্যরা।
প্রথমবার ফাইনাল খেলেই চ্যাম্পিয়ন তামিম। তার খুনে ব্যাটিংয়েই ফাইনালে ঢাকা ডায়নামাইটসকে ১৭ রানে হারিয়ে শিরোপা জিতে কুমিল্লা। ৬১ বলে অপরাজিত ১৪১ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলেছেন তামিম। আর সেটিই আবারও কুমিল্লার দেশসেরা দল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় রসদ।
১০ চার, ১১ ছক্কায় সাজানো ইনিংসটাকে বিস্ফোরক বললেও কম বলা হয়। খোদ তামিমের কাছে যেটি স্বপ্নের ইনিংস। শুক্রবার ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘সত্যি বলতে, আমি এখনও স্বপ্নে আছি। এখনও বুঝতে পারছি না, কিভাবে ব্যাট করলাম। সত্যিই জানি না। ঘরে গিয়ে হাইলাইটস দেখার পর হয়তো ভালো করে বুঝতে পারব।’
টি-২০ ক্যারিয়ারে তামিমের এটি তৃতীয় সেঞ্চুরি। বিপিএলে প্রথম। ২০১৩ সালে বিজয় দিবস টি-২০ টুর্নামেন্টের পর ২০১৬ টি-২০ বিশ্বকাপে ধর্মশালায় ওমানের বিরুদ্ধে করেছিলেন সেঞ্চুরি। শুক্রবার ছাড়িয়ে গেছেন আগের কীর্তিকে। বিপিএলে সেঞ্চুরির বাসনা পূরণ হয়েছে এই বাঁহাতির। যে ইনিংসের আত্মবিশ্বাসের অনুবাদ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও করতে চান তিনি।
তামিম বলেছেন, ‘ইনিংসটি আমাকে একটা শিক্ষাও দিল, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে আমি কিভাবে কাজে লাগাতে পারি। ঢাকার বোলিং আক্রমণ যেমন ছিল, অনেক আন্তর্জাতিক দলের বোলিং আক্রমণও এত ভালো থাকে না। এখানে এভাবে ব্যাট করতে পারলে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতেও না পারার কারণ নেই। অনেক শিখেছি।’
বাংলাদেশের পঞ্চপান্ডবদের মধ্যে মাশরাফি-সাকিবের পর বিপিএল ট্রফি জেতার তালিকায় নাম লেখালেন তামিম। তিনি বলেছেন, ‘আমার খুব ইচ্ছে ছিল ট্রফি জয়ের। সবসময়ই চেয়েছি বিপিএল জিততে। ভারটা এখন নেমে গেছে।’
অতীতে বিপিএলের ফাইনালগুলোর ভাগ্য নির্ধারিত হতো বিদেশি ক্রিকেটারদের দাপুটে নৈপুণ্যে। শুক্রবার সে ধারা বদলে দিয়েছেন তামিম। এটি বড় অর্জন বলেই মনে করেন তিনি। বলেছেন, ‘বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার আজ ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে। এর চেয়ে বড় কিছু আমার কাছে আর হতে পারে না।’
তবে বিপিএল জয়ে অগ্রজ মাশরাফির মন্ত্র কাজে লাগিয়েছেন তামিম। বলেছেন, ‘মাশরাফি ভাইয়ের ট্যাকটিকস কাজে লাগাচ্ছিলাম। জানি না উনার মনে কি থাকে, কিন্তু একটা কথা উনি সবসময় বলেন, আমি জিতব, আমি জিতব, আমি জিতব। এবার পুরো বিপিএলে আমার এটিই ট্যাকটিকস ছিল। উনার থেকেই কপি করা বলতে পারেন।’
বিপিএল ২০১৯
সর্বোচ্চ রান
ব্যাটসম্যান দল রান সেরা
রাইলি রুশো রংপুর রাইডার্স ৫৫৮ ১০০*
তামিম ইকবাল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ৪৬৭ ১৪১*
মুশফিকুর রহিম চিটাগং ভাইকিংস ৪২৬ ৭৫
নিকোলাস পুরান সিলেট সিক্সার্স ৩৭৯ ৭৬*
সর্বোচ্চ উইকেট দল উইকেট সেরা
সাকিব আল হাসান ঢাকা ডায়নামাইটস ২৩ ৪/১৬
তাসকিন আহমেদ সিলেট সিক্সার্স ২২ ৪/২৮
মাশরাফি বিন মুর্তজা রংপুর রাইডার্স ২২ ৪/১১
রুবেল হোসেন ঢাকা ডায়নামাইটস ২২ ৪/২৩
পরিসংখ্যানে বিপিএল ২০১৯
সেরা ইনিংস : ১৪১* (তামিম ইকবাল-কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স)
সেরা বোলিং ফিগার : ৪/১০ (কামরুল ইসলাম-রাজশাহী কিংস)
সর্বোচ্চ ছক্কা : ২৮ টি (নিকোলাস পুরান-সিলেট সিক্সার্স, আন্দ্রে রাসেল-ঢাকা ডায়নামাইটস)
সর্বোচ্চ ডিসমিসাল : ১৯ টি (নূরুল হাসান সোহান-ঢাকা ডায়নামাইটস)
সর্বোচ্চ ক্যাচ : ৯ টি (আফিফ হোসেন ধ্রুব-সিলেট সিক্সার্স, সাব্বির রহমান-সিলেট সিক্সার্স ও তামিম ইকবাল-কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স)
সর্বোচ্চ দলীয় রান : ২৩৯/৪ (রংপুর রাইডার্স, প্রতিপক্ষ চিটাগং ভাইকিংস)
সর্বনিম্ন দলীয় রান : ৬৩ (কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স, প্রতিপক্ষ রংপুর রাইডার্স)
সর্বোচ্চ রানের জুটি : ১৮৪* (হেলস-ভিলিয়ার্স, রংপুর রাইডার্স)
