সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জনবল বৃদ্ধি

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:২৩

গত জুলাই মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরকারি চাকুরিতে পদ শূন্য রহিয়াছে ৩ লক্ষ ৮৭ হাজার ৩৩৮টি। ইহা মোট পদের ২১ দশমিক ২৭ শতাংশ। একদিকে সরকারি পদ খালি রহিয়াছে, অন্যদিকে করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে বাড়িতেছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। এই জন্য সম্প্রতি সরকারি শূন্য ‘পদগুলি দ্রুত পূরণের নির্দেশ দিয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লক্ষণীয় বিষয় হইল, ১৯৮৩ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে প্রণীত এনাম (ব্রিগেডিয়ার এনাম আহমেদ) কমিটির সুপারিশ ও জনবলকাঠামো (অর্গানোগ্রাম) অনুযায়ী চলিতেছে আমাদের প্রায় সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর। গত ৩৮ বত্সরেও আমরা ইহা হালনাগাদ করিতে পারি নাই। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এই ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হইয়াছে। আমরা আশা করি, এই বিষয়টি আগামী দিনগুলিতে আরো গুরুত্ব দিয়া ভাবা হইবে। কেননা পুরাতন জনবলকাঠামো দিয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা আজ বলিতে গেলে অসম্ভব। দেখা যাইতেছে, সরকারি কিছু অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী দিবারাত্রি কাজ করিতেছেন, আবার কোনো কোনো অফিসে তেমন কোনো কাজের চাপ নাই। সরকারি অফিসে দক্ষ এবং বিশেষ করিয়া তথ্যপ্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ লোকের অভাব পরিলক্ষিত হইতেছে। সকল মন্ত্রণালয়ের কথা না বলিয়া আজ আমরা সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে পারি।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হইল সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বয়স্ক, বিধবা বা স্বামী-নিগৃহীতা, প্রতিবন্ধীসহ সমাজের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভাতা দেওয়া হয়। দেওয়া হয় শিক্ষা উপবৃত্তিও। এই ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে শুরু হইয়াছে অনলাইন সেবা কার্যক্রম। কিন্তু সমাজসেবা অধিদপ্তরে তথ্যপ্রযুক্তির (আইসিটি) কোনো পদ নাই। ডিজিটাল যুগে লক্ষ লক্ষ সেবাগ্রহীতার একটি প্রতিষ্ঠানে আইসিটির কোনো পদ না থাকা দুঃখজনক। ফি বত্সর ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িতেছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এইরূপ সেবাগ্রহীতার সংখ্যা হইবে প্রায় ৩ কোটি। চলতি অর্থবত্সরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে ১ লক্ষ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। ইহা মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। কিন্তু বাজেট বাড়িলেও এই খাতে জনবল বাড়ানো হইতেছে না। ফলে বিভিন্ন ভাতাভোগীর ভোগান্তি ও দুর্ভোগ বাড়িতেছে। বর্তমানে ১ হাজার ৭৪০টি ইউনিয়নে কোনো সমাজকর্মী নাই। একজন সমাজকর্মীর ১৪টি ইউনিয়নেও কাজ করিবার উদাহরণ রহিয়াছে। কোনো কোনো উপজেলায় অর্ধলক্ষ সেবাগ্রহীতা রহিয়াছে। সেইখানে যদি পর্যাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকেন, তাহা হইলে সেখানে ভাতাভোগীদের বিড়ম্বনা ও অন্যায়-অনিয়ম দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। ইহাতে নিয়মিত ভাতা পরিশোধ বই লেখা, অনলাইনে ভাতা পাইতে মোবাইল ফোন নম্বর যুক্ত করা, এনআইডির সমস্যা দূর করা এবং ব্যাংক হিসাবে টাকা পৌঁছাইতে বিলম্বসহ নানা ভোগান্তির সৃষ্টি হইতেছে। ১৯৮৪ সালের পর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কাজের পরিধি বাড়িলেও মাঠ পর্যায়সহ বিভিন্ন অফিসে ইহার জনবল কেন বাড়ানো হইবে না তাহা আমাদের বোধগম্য নহে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতের উন্নয়নের উপর যে কোনো সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি জড়িত। সুশাসনের জন্যও এখানে কোনো জনবলের ঘাটতি থাকিতে পারে না। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ফাঁক দিয়া যাহাতে কেহ বাহির হইয়া যাইতে না পারে এবং কোনো হতদরিদ্র ব্যক্তি যাহাতে ইহার বাহিরে থাকিতে না পারে, এই জন্য সুনিবিড় তদারকি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতির উন্নতি বিধানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ৫ হাজার ৫৬৯টি পদ সৃজনের যে প্রস্তাব করিয়াছে তাহা দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সরকারি খাতেও নূতন নূতন চাকুরির ক্ষেত্র তৈরি করা আজ আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে।