ফার্মেসি হচ্ছে ওষুধ তৈরির বিজ্ঞান। আর মানবদেহে ওষুধ প্রয়োগের পরবর্তী সময় কেমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা নিরূপণ করেন ফার্মাসিস্ট। ফার্মেসি বহু শৃঙ্খলাবদ্ধ স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা। যেখানে রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের সমন্বয়ে গঠিত হয় ওষুধ বিজ্ঞান। পাশাপাশি এ শাখায় ওষুধশিল্প নিয়ে বিভিন্ন রকম কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। যেমন—ওষুধ প্রস্তুতকরণ, এর মান নির্ধারণ, ব্যবহার ইত্যাদি বিষয় এখানে প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে ওষুধ প্রস্তুতকরণ, এর মান নির্ধারণ, ডোজ নির্ধারণ কিংবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যারা সরাসরিভাবে যুক্ত থাকেন তারাই হলেন ফার্মাসিস্ট।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রথম সারির পছন্দের সাবজেক্টের শীর্ষে রয়েছে ‘ফার্মেসি’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের মোট ৪০টি পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। চার বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসার জন্য প্রস্তুত হন এক জন ফার্মাসিস্ট। বি.ফার্ম শেষ করে চার বছর পর এক জন শিক্ষার্থীর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘ফার্মেসি কাউন্সিল অব বাংলাদেশ’ কর্তৃক প্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ট্যাগ। এদের বলা হয় ‘এ’ ক্যাটেগরি ফার্মাসিস্ট এবং এদের কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার দেওয়া হয়। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মেসি, কমিউনিটি ফার্মেসি ইত্যাদি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখেন। প্রথম সারির ফার্মাসিস্টদের পরেই আসে তিন বছরের ডিপ্লোমা ফার্মেসি কোর্সকৃত ফার্মাসিস্ট। যাদের বলা হয় ‘বি’ ক্যাটেগরি ফার্মাসিস্ট। ডিপ্লোমা কোর্স ছাড়াও ছয় মাসের কোর্স যারা করেন এরাও ফার্মাসিস্ট। যাদের বলা হয় ‘সি’ ক্যাটেগরি ফার্মাসিস্ট। এদের মূলত কাজ ওষুধ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখা। ওষুধ বিক্রির পূর্বশর্ত অনুযায়ী তাদের জন্য প্রিলিমিনারি এই কোর্সটি বাধ্যতামূলক।
এক জন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রধান দায়িত্ব ওষুধ প্রস্তুতকরণ। ফার্মাসিস্টদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল দায়িত্বের পাশাপাশি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হসপিটাল ফার্মেসি পরিচালনা করা। রোগী অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে চিকিত্সার জন্য আসবে, চিকিত্সক শারীরিক পরীক্ষানিরীক্ষা শেষে রোগ বিবেচনা করে ফার্মাসিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ দিবেন। অন্যথায় কোন ডোজের ওষুধ রোগীর জন্য প্রযোজ্য, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী হতে পারে তা নিরূপণ করা কঠিন। স্বাস্থ্যসেবায় চিকিত্সক, ফার্মাসিস্ট, নার্স ও টেকনোলজিস্টের সমন্বয়ে রোগীর চিকিত্সা হওয়াটা সঠিক পদ্ধতি। কিন্তু আমাদের দেশে চিকিত্সক, নার্স এবং টেকনোলজিস্ট দ্বারা চিকিত্সাসেবা চললেও নেই ফার্মাসিস্টদের সঙ্গে সমন্বয়। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা একপ্রকার অবহেলিত এক্ষেত্রে। ওষুধের ডোজ কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে বিস্তর ধারণার অভাবে এক জন রোগীর নানা রকম শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমান চিকিত্সাসেবায় চিকিত্সকের পর নার্স দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্যই এক জন নার্সের পক্ষে ওষুধের বিষদ নিরূপণ কখনো সম্ভব নয় কিংবা হওয়ার কথাও নয়। সুতরাং ওষুধের মান বিবেচনার ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টের বিকল্প ভাবাই যায় না।
তাছাড়াও কমিউনিটি ফার্মাসিস্টদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে ব্যাপক। তারা ওষুধের নির্ভুলতা এবং বৈধতা নিশ্চিত করে রোগীর প্রেসক্রিপশনের ওষুধগুলোর কম্পাউন্ডিং, চেকিং এবং বিতরণ করে থাকে। সেই সঙ্গে কমিউনিটি ফার্মাসিতে ওষুধের যথাযথ সংগ্রহ, সঞ্চয়, সরবরাহ এবং ডকুমেন্টেশন ও রেকর্ড সংরক্ষণ করে থাকেন। পেশেন্ট কাউন্সেলিং কমিউনিটি ফার্মাসিস্টদের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
উন্নত বিশ্বের চিকিত্সা ব্যবস্থায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে খুব অল্পসংখ্যক বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের দেখা মিলে। অন্যদিকে দেশে নিজেদের যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে, বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে দেশের মেধাবী গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা। এটি আমাদের জন্য মোটেও স্বস্তির সংবাদ নয়। মেধাবী গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা দেশের অনন্য সম্পদ। ওষুধ শিল্পে আমাদের দেশের অবস্থান অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ এগিয়ে। ওষুধ শিল্পে দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে প্রায় ১৬০টির অধিক দেশে আমরা ওষুধ রপ্তানি করতে সক্ষম। এর দ্বারাই প্রমাণিত হয় দেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতার পরিচয় বহন করেন। এই ধারাকে আরো সামনে এগিয়ে নিতে দেশের মেধাবী ফার্মাসিস্টদের যথাযথ মূল্যায়ন একান্ত প্রয়োজন।
দেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের বেকারত্বের সমস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের একমাত্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরই কর্মসংস্থানের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাদের জন্য হসপিটাল ফার্মেসি, কমিউনিটি ফার্মেসি দ্বার উন্মোচিত করা সময়ের দাবি। এর আগে গত বছর স্বাস্থ্যসেবা খাতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের নিয়োগদানের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। যেটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার কিন্তু করোনা মহামারির শুরুর পর থেকে সেটা প্রজ্ঞাপনেই আটকে আছে। আটকে থাকা প্রজ্ঞাপন থেকে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ কার্যক্রম বাস্তবায়নের দিকে নিতে হবে। দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হসপিটালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের অবস্থান নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে সদয় দৃষ্টি দিতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
