আন্তর্জালের বিপজ্জনক ফাঁদ ও শিশুদের সুরক্ষা

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০৮

 ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরা পড়ে, কে জানে।’ রবীন্দ্রনাথ যখন এই কবিতা রচনা  করেন, তখন এই সময়ের তুলনায় পৃথিবী ছিল অনেক বেশি নিরাভরণ। এখন ‘প্রেমের’ ছদ্মবেশে ‘প্রতারণা’ উঁকি দেয় আন্তর্জালের ভিতর দিয়া। ইন্টারনেট এখন শিশু-কিশোরদেরও হাতের মুঠোয়। তাহাদের সারল্যকে পুঁজি করিয়া ইন্টারনেটে ফাঁদ পাতা অনেক বেশি সহজ। না বুঝিয়া কিংবা প্রলোভনে পড়িয়া শিশু-কিশোরেরা খুব সহজেই বিপথগামী হইয়া পড়ে। সমপ্রতি ইউনিসেফ সতর্ক করিয়া দিয়া বলিয়াছে যে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ হইতে ১৭ বত্সর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উত্পীড়নের শিকার। স্পষ্টতই ওই প্রতিবেদন বলিতেছে যে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট একটি নির্দয় মরুভূমিতে পরিণত হইয়াছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বত্সর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করিতে শুরু করে। ইহা ছাড়া, প্রায় ৬৩ শতাংশ শিশু প্রাথমিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্থান হিসাবে তাহাদের নিজেদের কক্ষটিকেই ব্যবহার করিতেছে।

সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ব্যাপকহারে বাড়িয়াছে। ২০০০ সাল হইতে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে আটশত গুণের অধিক। কিন্তু ইন্টারনেট কী করিয়া নিরাপদে ব্যবহার করিতে হয়, তাহা অধিকাংশ ব্যবহারকারীই জানেন না। বিশেষ করিয়া শিশু-কিশোর-কিশোরীরা। তাহারা ইন্টারনেটে নিয়মিত সবচাইতে বেশি যেই দুইটি কাজ করিয়া থাকে তাহা হইল অনলাইন চ্যাটিং (বার্তা আদান-প্রদান) ও ভিডিও দেখা। প্রতিদিন গড়ে ৩৩ শতাংশ সময় অনলাইন চ্যাটিং এবং ৩০ শতাংশ সময় ভিডিও দেখিয়া থাকে। সমীক্ষায় উঠিয়া আসিয়াছে যে, ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে। এমনকী জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ তাহাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলিয়া সেই অনলাইন ‘বন্ধুদের’ সহিত সরাসরি দেখা করিবার কথাও স্বীকার করিয়াছে। ইহার পরিণামে শিশুরা অনলাইনে যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন হইতেছে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের অভাবে শিশুদের এই ঝুঁকি বাড়িতেছে।

আমরা দেখিয়াছি, সচেতন অভিভাবকেরা সন্তানদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস ও প্লাটফরম হইতে নির্দিষ্ট বয়স অবধি দূরে রাখেন। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যেমন তাহার সন্তানদের প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া অবধি অনলাইনে কোনো সোশ্যাল নেটওয়ার্কের সহিত যুক্ত হইতে দেন নাই। বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের বিষয়ে আমাদের দেশের অভিভাবকসহ শিশুরা এত বেশি অসচেতন যে, তাহাদের ফাঁদে ফেলিবার জন্য অপরাধীদের খুব বেশি বেগ পাইতে হয় না। সুতরাং সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন হইতে হইবে। অনলাইনে শিশুদের যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কোনো স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর তৈরি করা হয় নাই এখন অবধি। এমনকী শিশুদের সুরক্ষায় সমন্বিত কোনো আইনও প্রণয়ন করা হয় নাই। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো তত্পর হইবে।