মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি দামি কথা বলেছেন, তা হলো গ্রাম হবে শহর। গ্রামকে আধুনিক নগর সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু কীভাবে গ্রামকে নগরে পরিণত করে গ্রামের মানুষকে দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা যায়, সেটির বিভিন্ন আইডিয়া তৈরি করে স্বপ্নটিকে বাস্তব রূপ দিতে হবে। সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় গ্রামকে কীভাবে শহরে রূপ দেওয়া যায় তার একটি গাইডলাইন তৈরি করে কর্মপন্থা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তাদের মতে, সারা দেশে গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিদ্যুত্ সুবিধা প্রদান ও ডিজিটাইজেশন। এখন গ্রামের মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন দরকার। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি ও সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন তারা। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আরও বেশি অবদান রাখতে তাঁদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে কৌশল গ্রহণের কথা বলা হয়। গ্রামকে শহরের রূপ দিতে অনেকেই গ্রামাঞ্চলে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা ভাবছেন। এটি প্রকৃতপক্ষে একটি ভুল ধারণা। গ্রামের মানুষের প্রয়োজনকে উপলব্ধি করে বহুতল ভবন হতে পারে। কিন্তু শহরের বাসিন্দারা যেসব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন গ্রামের মানুষরাও যাতে করে সেই নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পান, তার নিশ্চয়তা প্রদানই এই ধারণার মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত।
গ্রামকে শহরে পরিণত করতে হলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে পরিকল্পনার মাধ্যমে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যাতে করে এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব হয়। গ্রামীণ অর্থনীতির মূল শক্তি হলো কৃষি। বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির ধান আবিষ্কার করেছেন। এই ধরনের গবেষণালব্ধ ধান, খাদ্যশস্য মাটির প্রকৃতি, আবহাওয়া, উত্পাদনশীলতা বিবেচনা করে আবিষ্কার করা হয়েছে। কৃষিকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে এর মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে এর রপ্তানিকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। গ্রামের কৃষককে জানাতে হবে কিভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা যায়। গ্রামের কৃষি অর্থনীতিকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষির উত্পাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষককে প্রযুক্তিবান্ধব করার পরিকল্পনাকে এই বিনিয়োগের আওতায় আনতে হবে।
আমাদের দেশে ৭-৮ লাখ কুটির শিল্প বিদ্যমান রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কুটির শিল্পগুলোর যথেষ্ট অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। সময় বদলেছে, সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির ও মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। কিভাবে এই কুটির শিল্পগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি বান্ধব করে গ্রামের বেকার যুবকদের এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, সেই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। আরেকটি বিষয় এখানে ভেবে দেখা যেতে পারে তা হলো— এই কুটির শিল্পগুলোকে রপ্তানিমুখী পণ্যে রূপান্তরিত করে কিভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিশ্বায়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। ‘একজন মানুষ ও একটি শিল্প’ এই কার্যক্রম গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে। আবার এই শিল্পায়নগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কিভাবে উন্নত থেকে উন্নততর করা যায় সে বিষয়টি নিয়ে গ্রামের মধ্যেই গবেষণাবান্ধব পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যায়। ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে গ্রামের তরুণ ও যুবকদের প্রশিক্ষিত করে এই ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
আমরা ধূমপানমুক্ত গ্রাম, নিরক্ষরমুক্ত গ্রাম, মাদকমুক্ত গ্রাম এই ধরনের অনেক ইতিবাচক কথা বলে থাকি। কিন্তু কখনও আমরা ‘অর্থনীতিতে স্বনির্ভর গ্রাম’ এই কথাটি বলি না। কিন্তু প্রতিটি গ্রামকে অর্থনীতিতে স্বাবলম্বী করে কীভাবে দেশ ও বিশ্বের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে গ্রামকে উন্নয়নের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা যায়— সেই বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। গ্রামের মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। গ্রামের মানুষের ভেতরের উদ্ভাবনী শক্তিকে বের করে এনে কীভাবে সেটি দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়— সেই বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে যে উন্নয়নের বৈষম্য রয়েছে তা দূর করে গ্রামীণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হবে। মানুষের জীবন এখন অনেকটা শহর ও ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন ঢাকা শহরে মানুষের চাপ বাড়ছে। যদি গ্রামকে শহরের আদলে গড়ে তোলা যায়— তবে মানুষ ঢাকা বা শহরমুখী হবে না। আমরা অনেক সময় ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলি। কিন্তু নাগরিক সুবিধা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমেই যে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব সেটি নিয়ে আমাদের ভাবনার জায়গাটি সৃষ্টি করতে হবে। ঢাকা বা শহরগুলোতে ভালোমানের শিক্ষার পরিবেশ থাকলেও গ্রামের মধ্যে তা এখনও পর্যন্ত গড়ে তোলা যায়নি। এর কারণ হলো ঢাকা বা শহরগুলোতে যে বিশ্বমানের নাগরিক সুবিধা আমরা দিতে পারছি, গ্রামীণ অবকাঠামোতে সেই সুবিধা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এই জন্য সরকারকে গ্রামে শহরের সমতুল্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। যদি আমরা গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শহরের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মধ্যে বৈষম্য দূর করতে পারি তবেই গ্রাম শহরে পরিণত হবে। একইভাবে আমরা যদি গ্রামের চিকিত্সা ব্যবস্থাপনা ও শহরের চিকিত্সা ব্যবস্থাপনার মধ্যে বৈষম্য দূর করে নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে পারি তবেই গ্রাম নগরের রূপ লাভ করবে।
গ্রামকে সবুজায়ন প্রকল্পের আওতায় এনে এক একটি গ্রামকে সবুজ শহরে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে ও তার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। গ্রামের মানুষের বসবাসের জন্য যে আবাসস্থল রয়েছে তা উন্নত দেশের গ্রামীণ গৃহনির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যে এনে গ্রামকে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো যেতে পারে। এর সঙ্গে গ্রামে বৃক্ষরোপণ প্রক্রিয়াকে আন্দোলনে রূপ দিয়ে সবুজায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। গ্রামকে গ্রামের আদলে রেখে শহরকেন্দ্রিক অন্য যে উপাদানগুলো রয়েছে তা গবেষণার মাধ্যমে বের করে এনে তার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। গ্রামের মানুষ ও শহরের মানুষের মধ্যে যাতে কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্যের মনোভাব সৃষ্টি না হয় সে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। তথ্যের অবাধ সুবিধা গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। গ্রামের মানুষ যে শহরের মানুষ থেকে ভিন্ন সত্তা নয়, এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এভাবেই গ্রামের মানুষ শহরের সুবিধার সবটুকু সুফল ভোগ করে তাদের ভেতরের অমিত শক্তিকে ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে। এর মাধ্যমে গ্রাম এগোবে, মানুষ এগোবে ও দেশ এগিয়ে যাবে।
n লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
