বাংলাভাষার বিকৃত চর্চা রোধ হোক

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:১০

বছর ঘুরে আবারো এলো ফেব্রুয়ারি; ভাষা, গৌরব,  চেতনা, আত্মত্যাগ ও আবেগের মাস। ১৯৫২ থেকে ২০১৯; দেশের সীমানা পেরিয়ে বাংলাভাষার মর্যাদা এখন বিশ্বময়। ফেব্রুয়ারি এলেই দেশে দেশে পরম গর্বে শ্রদ্ধায় স্মরণ হয় বাংলাভাষা। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধায়-শোকে নত হয়ে আসে বিশ্বের মানুষের মাথা। ফেব্রুয়ারি একদিকে শোকাবহ মাস হলেও অন্যদিকে বাঙালি জাতির জন্য গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

বায়ান্নর এ মাসেই  সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে মাতৃভাষার অধিকারকে সর্বজনীন মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। বাঙালিই পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা ভাষার জীবন দিয়েছে, আর সেজন্য দিবসটি পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আজ আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে বলতে পারছি- আমাদের মাতৃভাষা অর্জনের কীর্তিগাথা।

ভাষাসৈনিকদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল মাতৃভাষা অর্থাত্ বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আমাদের এ বাংলাভাষার প্রতি আমরা কতটুকু যত্নশীল ও সচেতন তা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়; কারণ চারদিকে চলছে আজ ভাষা বিকৃতির মহোত্সব। অত্যন্ত রুচিহীনভাবে আমাদের গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাভাষাকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিশেষ করে টেলিভিশন ও এফএম রেডিওগুলোয়। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অনুকরণ করা আজকাল একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে তাদের অদ্ভুত বাচন-ভঙ্গিতে বিকৃত ভাষার ব্যবহার লক্ষণীয়। পৃথিবীর অন্য কোথাও মাতৃভাষাকে এমনভাবে বিকৃত করার নজির আছে কিনা জানা নেই। অনেকের কাছে বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দির সংমিশ্রণে তৈরি নতুন ধরনের ভাষা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আধুনিকতার নামে বর্তমান প্রজন্মের কাছে বাংলাভাষার ব্যবহার প্রয়োগ এবং উচ্চারণে ভিন্ন ভাষার মিশ্রণ ও শব্দের বিকৃত উপস্থাপন প্রবণতা প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও শহীদদের আত্মত্যাগ শুধু পাঠ্যসূচীতে কিংবা ফেব্রুয়ারির জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করার বা করানোর চেষ্টা করতে হবে। কাজটা বাচ্চাদের বিদ্যালয় শুরু থেকেই করতে হবে। কারণ ছেলেবেলায় শেখা জিনিস মনে গেঁথে যায়। শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণকে শিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করে নিতে হবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গেছেন, ‘আগে চাই বাংলাভাষার গাঁথুনি, তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন’। চিন্তার দিক থেকে আমাদের হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক, কিন্তু পরিচয়ে থাকতে হবে বাঙালিয়ানার সুস্পষ্ট ছাপ। বাঙালির ঐতিহ্য, কৃষ্টি, আবহমানকালের সংস্কৃতি সমুন্নত রাখার প্রত্যয় প্রতিটি বাঙালির অন্তরে থাকা উচিত। একটি জাতিকে বিলীন করতে হলে তার ভাষাকে বিলীন করে দিলেই অনেকটা কাজ সহজ হয়ে যায়। ভাষাগত শিক্ষাটা শুরুই হয় পরিবার থেকে, একটি শিশুকে যদি তার পরিবার ছোট থেকেই শুদ্ধ ভাষা ও নিজ ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা শিক্ষা দিতে পারে তবে পরবর্তী জীবনে তার ভাষা বিকৃত হবার সম্ভবনা কমে যায় অনেকাংশেই। অনেকেই মনে করে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলাটা পশ্চাত্পদতা; আর ইংরেজি-বাংলার মিশ্রণ মানেই আধুনিকতার উপলব্ধি। এই বোধটা প্রচলনের জন্য আমরাই দায়ী। যদি আমাদের কেউ জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে  কত নম্ব্বর পেয়েছো?’ আমরা মুখ টিপে হাসবো যে কি ক্ষ্যাত! এক্সাম না বলে পরীক্ষা বলছে! ম্যাথ না বলে গণিত বলছে! মার্কস না বলে নম্ব্বর বলছে! কারণ আমাদের নিজের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব আছে। আর হ্যাঁ বাংলাভাষা সর্বস্তরে প্রচলনের জন্য আইন করা হয়েছে, অনেকেই বিকৃতি রোধে কথা বলছে কিন্তু যদি আত্মসচেতনতা তৈরি না হয় তবে আইন করে কিছু হবে না। তবে অবশ্যই প্রচার মাধ্যমগুলোতে বিকৃত ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার আইন করে বন্ধ করা উচিত কারণ মানুষ তো শুনেই শিখে।

আমাদের বাঙালিত্বের প্রধান বাহক ও প্রতীক এই ‘বাংলাভাষা’টির অস্তিত্বই যদি এভাবে হুমকির মধ্যে পড়ে, তাহলে তার ভেতর থেকে উত্সারিত ও উপজাত আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিটিকেও বেশিদিন সসম্মানে টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই আজ সময় এসেছে নতুন করে শপথ নেবার; আমাদের বাঙালিত্বকে সমুন্নত রাখার। মুখে নিয়ে প্রাণের বর্ণমালা, গল্পে, উচ্চারণে, গানে, ফেব্রুয়ারি আলোকিত হয়ে উঠুক স্বমহিমায়, গৌরবে, আনন্দে। চলনে বলনে বাঙালির নতুন করে শপথ হোক ভাষার মর্যাদা রক্ষায়, শুদ্ধ করে বাংলা উচ্চারণের। চারপাশে ধ্বনিত হোক সেই অমিয়বাণী, সেই কালজয়ী গান— ‘আমার ভাইয়ের রক্তের রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়