শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:০৮

প্রায় দেড় বত্সর বন্ধ থাকিবার পর অবশেষে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানাইয়াছে সরকার। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর হইতে প্রাথমিক হইতে শুরু করিয়া উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম আরম্ভ হইবে। দীর্ঘ সময় দেশের শিক্ষা কার্যক্রমে অচলাবস্থার পর ইহা নিঃসন্দেহে স্বস্তির সংবাদ। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর তথ্যমতে, করোনা মহামারি শুরু হইবার পরে সমগ্র বিশ্বে সবচাইতে অধিক সময় ধরিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা দেশসমূহের মধ্যে যৌথভাবে শীর্ষে রহিয়াছে বাংলাদেশ। তবে ইহা সত্য, জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশের কোভিড-বাস্তবতা বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের চাইতে ভিন্ন। যদিও করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের অনেক দেশের চাইতে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রহিয়াছে বাংলাদেশ, তাহার পরও এই দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের বিষয়টি বরাবরই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইয়াছে। অস্বীকার করিবার উপায় নাই, করোনা মহামারিকালে সরকার শিক্ষার্থী ও নতুন প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়াছে, কারণ বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই তরুণ ও যুব প্রজন্ম—যাহাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ অর্থাত্ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বলা হইয়া থাকে; কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখিবার নেতিবাচক প্রভাব যে শিক্ষার্থীদের উপর একেবারেই পড়ে নাই, তাহা তো নহে!

শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু হইবার বিষয়টি ইতিবাচক হইলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইবে। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিবার প্রেক্ষাপটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানিতে উদ্বুদ্ধ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাসহ ১৯ দফার নির্দেশনা প্রকাশ করা হইয়াছে। নির্দেশনায় বিশেষভাবে বলা হইয়াছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশমুখসহ অন্যান্য স্থানে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে করণীয় সম্পর্কে ব্যানার প্রদর্শন, শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্রের মাধ্যমে নিয়মিত তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ রাখা, সকলের জন্য বিভিন্ন স্থানে সাবান ও হ্যান্ডওয়াশের ব্যবস্থা করা, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে নিয়মিত শিক্ষণীয় ও উদ্বুদ্ধকারী ব্রিফিং দেওয়া, ক্লাসরুমসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন ও আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং শিক্ষার্থীদের বসিবার ক্ষেত্রে তিন ফুট শারীরিক দূরত্ব রাখা ইত্যাদি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হইতেছে কি না, তাহা পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়ন করিবার জন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের কথাও বলা হইয়াছে। নিঃসন্দেহে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিবার বিষয়টিতে অধিক গুরুত্ব আরোপ করিয়াছে, যাহা প্রশংসনীয়; কিন্তু ইহাও মনে রাখিতে হইবে, ইতিপূর্বে শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, শিল্পকারখানা ইত্যাদি চালু করিবার পূর্বেও সরকার যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিবার ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশনা আরোপ করিয়াছিল; কিন্তু বাস্তবে তাহা যথাযথভাবে অনুসরণ করিতে দেখা যায় নাই। ইহাই আমাদের মতো জনবহুল দেশের বাস্তবতা, এই বাস্তবতাকে সামনে রাখিয়াই আমাদের অগ্রসর হইতে হইবে। কেননা দীর্ঘ সময় ধরিয়া একটি দেশের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকিতে পারে না। উহার সহিত জড়াইয়া আছে দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ভাগ্য, দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির প্রশ্ন। এখন যেহেতু সরকার শিক্ষা কার্যক্রমে গতি আনিবার রোডম্যাপ প্রকাশ করিয়াছে এবং পর্যায়ক্রমে সকল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে ধীরে ধীরে উচ্চশিক্ষা, প্রতিষ্ঠানগুলিও খুলিয়া দেওয়ার আশা ব্যক্ত করা হইয়াছে, সুতরাং সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। 

করোনা বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরিয়া শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় যেই ক্ষতির সম্মুখীন আমরা হইয়াছি, তাহা পোষাইয়া লইবার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার কোনো বিকল্প ছিল না; কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দিলেই যে সকল সমস্যার সমাধান হইবে তাহা নহে, শিক্ষার পাশাপাশি যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনকেও সমান গুরুত্ব দিতে হইবে। আমরা আশা রাখি, সকল প্রকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিয়া দেশের শিক্ষা কার্যক্রমে গতির সঞ্চার হইবে এবং শিক্ষার্থীরা তাহাদের শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ ফিরিয়া পাইবে।