তরুণদের আবেগীয় ভারসাম্য রক্ষা জরুরি

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:১২

আবেগকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। আবেগকে অনেকেই অনুভূতির সমার্থক মনে করেন। অনেকে আবার আবেগ বলতেই নেতিবাচক অনুভূতিকে ধরে নেন। অনুভূতি শারীরিক বা মানসিক দুই-ই হতে পারে, আবেগ মূলত মানসিক। আবেগ হলো এমন বিষয় যা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রকাশ পায়। তবে মাঝেমধ্যে শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমেও এর প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে আমরা বলতে—পারি আবেগ হলো অনুভূতির প্রকাশ মাত্র।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আবেগের পাঁচটি উপাদান থাকা দরকার। এগুলোর মধ্যে আবেগের মানসিক বা আত্মনিষ্ঠ অনুভূতি, শারীরিক উত্তেজনা, শরীরবৃত্তীয় ভিত্তি, মৌখিক, ভাষাগত এবং অঙ্গ সঞ্চালনমূলক বহিঃপ্রকাশ, সংশ্লিষ্ট প্রেষণামূলক অবস্থা উল্লেখযোগ্য। সাধারণ মতামত অনুযায়ী আবেগ মূলত সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। মোটকথা আবেগ হলো ইতিবাচক এবং নেতিবাচক—এই দুইয়ের মিশ্রণ। পরিবেশ, পরিস্থিতি, বেড়ে ওঠা, পরিবার, সমাজ ইত্যাদি অনুযায়ী ব্যক্তির আবেগের ধরন ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হতে পারে।

সব বয়সের মানুষের মধ্যে আবেগ বিদ্যমান। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, তরুণদের মধ্যে আবেগীয় অনুভূতির উপাদানগুলো বেশি পরিলক্ষিত হয়। কেননা তরুণরা অদম্য, উত্সুক, নির্ভয়। তরুণেরা তাদের এই বয়সটাতে সব বিষয়কে আবেগ দিয়ে পরিমাপ করতে চায়, আবেগের ভিড়ে নিজেকে মেলে দেয়। তারা তাদের এই বয়সটাতে যে কোনো সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক, পরিস্থিতিকে আবেগ দ্বারা বিবেচনা করার চেষ্টা করে; কিন্তু তাদের এই অভ্যাস বা বয়সের বৈশিষ্ট্য সবসময়ই সঠিক ফল নিয়ে আসে না। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক আবেগে যেটাই অতিরিক্তভাবে প্রকাশ পাক না কেন, দুইটিতেই নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। যখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইতিবাচক আবেগটা বেশি কাজ করে তখন তারা নিজেকে বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করে, অন্যের কথার চেয়ে নিজে যেটা করতে ভালোবাসে, যেটাতে আনন্দিত হয় সেসব কাজ করতে চায়, আবেগের টানে সেসবে বেশি নিজেকে জড়িত করে, তা যতই ক্ষতিকর হোক না কেন, সেটাই তারা করতে চায়। যখন ইতিবাচক ফলাফলের চেয়ে নেতিবাচক ফলাফল বেশি হয়, তখন তাদের মানসিক অবস্থার অবনতি হয়, অনেকে আবার নেতিবাচক ফলের জন্য জীবনে পিছিয়ে পড়ে অনেকটা, নিজেকে গুটিয়ে নেয় এক কোণে। বিভিন্ন সম্পর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, একা থাকতে বেশি পছন্দ করে। এরকম অবস্থার ফলে অনেক তরুণ নানারকম মানসিক সমস্যার পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। আবেগের তাড়নায় কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়ে যায়, এছাড়া বিভিন্ন সমাজবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়ে, যা পরিবার, সমাজ, দেশের জন্য সর্বোপরি নিজের জীবনের জন্য হুমকি।

একটি তথ্যসূত্র বলছে, বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা এখন ৫০ লাখের বেশি। বেসরকারি জরিপ অনুযায়ী এই সংখ্যা বর্তমানে ৭০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। মাদকাসক্তদের ৯১ শতাংশ কিশোর ও যুবক। তাদের অধিকাংশেরই বয়স ২১ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অনেকটা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই দেশের সম্ভাবনাময় ও উজ্জ্বল তরুণসমাজ মাদকের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেদের আত্মবিনাশকে ত্বরান্বিত করেছে। তাদের আবেগীয় এই আচরণগুলো যেন তাদের জীবন চলার পথে বাধার সম্মুখীন না হয়, সেদিকে নজর রাখাটা জরুরি। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ এবং বিভিন্ন ধরনের সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণে পরিবারের কিছু ভূমিকা রয়েছে। তরুণদের আবেগীয় ভারসাম্য রক্ষায় পরিবার হলো মূল কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারের সদস্যদের অনেক সংবেদনশীল এবং দায়িত্বশীল হতে হবে সন্তানদের আচরণ এবং চলাফেরায়। প্রত্যেক বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। প্রত্যেক বাবা-মায়ের প্রতিদিন কিছুসময় তাদের সন্তানদের জন্য রাখতে হবে। ফলে সম্পর্কগুলোর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, ভরসা গড়ে উঠবে। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব পরিবারে সন্তান এবং অন্য সদস্যদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয় তাদের থেকে যাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ তারা যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নিজে থেকে না পারলে বাবা-মা কিংবা অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিজের সমস্যাগুলো ভাগাভাগি করতে পারে, এতে করে তারা সামাজিক কিংবা নিজস্ব যে কোনো সমস্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। 

শিক্ষকের ভূমিকাও জরুরি। তরুণ বয়সে ছেলেমেয়েরা পরিবারের থেকে শিক্ষকদের বেশি বিশ্বাস করে এবং ভরসা রাখে। ফলে তারা চায় শিক্ষকরা তাদের কথা শুনুক, তারা তাদের সমস্যাগুলো শিক্ষকের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাই শিক্ষকদের উচিত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সুসম্পর্কের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া, তাদেরকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া। মাঝেমধ্যে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন ধরনের গল্প বলা এবং বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা—যা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে কাজে দেয়। শিক্ষকদের মনে রাখা দরকার, তারুণ্যে ভরপুর এই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের আদর্শের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেন। সুতরাং, শিক্ষকদের হতে হবে শিক্ষার্থীর পরম ভরসার জায়গা, নিতে হবে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং অভিভাবকসূলভ দায়িত্ব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়