চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ হোক

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:১২

প্রকৃতির নিরবচ্ছিন্ন হাতছানি আর ট্রেনের জানালা দিয়ে আসা মনোমুগ্ধকর বাতাস রেলভ্রমণে শিশু-কিশোরসহ যে কারো মনকেই প্রশান্ত করে তোলে। রেলযাত্রায় সড়ক ও নৌপথের মতো দুর্ঘটনার প্রভাব না থাকায় এই স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ দেশের অধিকাংশ জনগণের কাছে পছন্দের তালিকার প্রথমেই স্থান পায়। তাই তো দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার রেলপথ ধরে অনেকেই শখের বসে উত্ফুল্লচিত্তে, আবার অনেকেই প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিনিয়ত ছুটে চলছে নিজেদের গন্তব্যস্থলে। কিন্তু এই রেলভ্রমণে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরের আঘাত ভয়াবহ এক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিছক কৌতূহল মেটাতে কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এক দুষ্টচক্র বরাবরই ট্রেনে পাথর ছুড়ে যাচ্ছে। এতে করে চালক, যাত্রীসহ রক্তাক্ত হচ্ছে সংশ্লিষ্টরা এবং গুরুতরভাবে আহত হয়ে মৃত্যুবরণও করছে অনেকে। ট্রেনে আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় তত্ক্ষণাত্ প্রাথমিক চিকিত্সা প্রদানের প্রয়োজনীয় উপকরণ না থাকায় আঘাতপ্রাপ্তদের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যায়। এছাড়া জাতীয় সম্পদ ট্রেনের দরজা-জানালার কাচ ও বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যানসহ অনেক কিছুই পাথরের আঘাতে ভেঙে যায়। প্রতি বছর এসব মেরামতে কোটি কোটি টাকাও ব্যয় করতে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

ট্রেনে পাথর ছোড়ার এসব ঘটনা বেশ পুরোনো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে এর মাত্রা। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, প্রতি বছর দেশ জুড়ে এমন শত শত ঘটনা ঘটছে, তবে কেবল আরোহীরা আঘাতপ্রাপ্ত হলেই তা পরিসংখ্যানে আসে, বাকিটা অগোচরেই থেকে যায়। ২০২০ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত কেবল পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ৭৪টি পাথর হামলা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। দেশব্যাপী লকডাউন না থাকলে এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারত বলে আশঙ্কা করছে তারা। সাম্প্রতিক সময়েও লালমনিরহাট-সান্তাহার ও রংপুর রুটে এমন দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। এছাড়া রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দেশব্যাপী ২০টি জেলার ৭০টি স্থানকে পাথর নিক্ষেপের চরম ঝুঁকিপূর্ণ জোন হিসিবে চিহ্নিত করেছে।

পাথর নিক্ষেপের এসব ঘটনায় দেশের প্রচলিত আইনের আলোকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকায় তা বারবার সংঘটিত হচ্ছে। এসবের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনকে আরো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের নজরদারি বাড়িয়ে সংশ্লিষ্টদের আইনানুসারে শাস্তি প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাথর নিক্ষেপের ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা উচিত। তাদের মাঝে সচেতনতাবোধ ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো দরকার। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রচারণার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষকবৃন্দ ও সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর পাথর নিক্ষেপের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রেল নিরাপত্তায় কড়া টহল রাখা জরুরি। জনসমাজকে সচেতন করতে প্রয়োজনে লিফলেট বিতরণ, পোস্টার প্রদর্শন ও সেমিনারের আয়োজন করার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে পূর্বগৃহীত আইনকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং রেললাইনের দুই ধারে অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করা দরকার। প্রয়োজনে ট্রেনের জানালায় হালকা নেটের আস্তরণ লাগিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য পাথর নিক্ষেপে আঘাতের হাত থেকে পরিত্রাণ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অপরাধকে দমন করে রেলভ্রমণ নিরাপদ ও রোমাঞ্চকর করা এখন সময়ের দাবি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়