মামলার বাদী ভুয়া। বাদী ও সাক্ষীর ঠিকানাও ভুয়া। এমনকি মামলা দায়ের করার জন্য উপস্থাপন করা বাদীর নোটারিও জাল। ঘটনাও পুরোপুরি সাজানো। তবে আসামির নাম ও ঠিকানা সঠিক। মামলা দায়েরের পর আদালত মামলাটি তদন্ত করতে না দিয়ে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করে। পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করে। জামিন শুনানি বিলম্ব হলে আসামিকে কয়েক সপ্তাহ কারাগারে হাজতবাস করতে হয়। শুধু তা-ই নয়, মাসের পর মাস কারাবন্দি থাকার রেকর্ডও আছে। এ ধরনের মামলার আসামিদের হয়রানির শেষ নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় এসব ভুয়া মামলাবাজ সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে সিআইডি।
সূত্র জানায়, শুধু হয়রানি নয়, জমিজমা ও বাড়ি দখল, অর্থ আদায়সহ নানা উদ্দেশ্য থাকে এ ভুয়া মামলাবাজদের। এ জাতীয় মামলার বাদী ভাড়াটে নারী-পুরুষ। মামলার সাক্ষীরাও ভাড়াটে হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। এছাড়া কিছু অসত্ আইনজীবী ও দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তারা জড়িত এই ভুয়া মামলাবাজ সিন্ডিকেটে।
গত ১৪ জুন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও অ্যাডভোকেট এমদাদুল হক বসিরের এ সংক্রান্ত একটি রিট মামলার প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ এই ভুয়া মামলাবাজ সিন্ডিকেটকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) এক মাসের মধ্যে মামলাবাজ সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি আদালত মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর সংযুক্তির আদেশও দিয়েছেন।
রিটে বলা হয়েছে, ঢাকার শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, মানব পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৪৯টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয় বলে রিট আবেদনে বলা হয়েছে। কিন্তু একটি মামলারও বাদীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ বিবেচনায় তিনি অনেক মামলায় খালাস পেয়েছেন। এর পরও তার বিরুদ্ধে এভাবে গায়েবি মামলা দিয়ে হয়রানি করায় তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এসব মামলায় তিনি ১ হাজার ৪৬৫ দিন জেল খেটেছেন বলেও রিটে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া গত বছরের ১৩ অক্টোবর ঢাকার তেজগাঁও থানাধীন মনিপুরীপাড়ার ১৪৭/সি নম্বর বাড়ি থেকে সৈয়দ রফিকুল ইসলাম দিলু নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায়। আসামি মামলার বাদী বা মামলার অভিযোগ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। গ্রেফতারের এক সপ্তাহ পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরবর্তী সময় তিনি আদালতে হাজির হয়ে ঐ মামলার বাদী সম্পর্কে জানতে চান। পরবর্তী সময় পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে যে বাদীর ঠিকানা ভুয়া। মামলার নোটারি ও স্বাক্ষর জাল। পরবর্তী সময় চলতি বছরের জুন মাসে বিষয়টি নিয়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা দায়ের করেন। গত ১৮ জুলাই বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ মামলাবাজ সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করার জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
সিআইডির একটি সূত্র জানায়, উচ্চ আদালত থেকে পাঠানো নির্দেশনা অনুযায়ী ভুয়া মামলাবাজ সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করার বিষয়টি তদন্তাধীন। এক শ্রেণির ভুয়া বাদী ও সাক্ষী বানিয়ে এসব মামলা দায়ের করা হয়। এর সঙ্গে অসত্ আইনজীবী ও অসাধু পুলিশ কর্মকর্তারাও জড়িত।
এ ব্যাপারে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) শেখ ওমর ফারুক গত বৃহস্পতিবার বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ভুয়া মামলার সিন্ডিকেট শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। এর মধ্যে একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৪৯টি মামলার সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করা হয়েছে। আরেকটি ঘটনায় ভুক্তভোগী সৈয়দ রফিকুল ইসলাম দিলুর ঘটনায় মামলার বাদীর ঠিকানা ভুল পাওয়া গেছে। এগুলো একটা সিন্ডিকেট, যারা দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিনিময়ে মিথ্যা মামলার বাদী ও সাক্ষী হয়। এই চক্রটিকে আমরা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।
