স্পেনের ফ্লেমেনকো আর সিলেটের কালনির সুর

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২৩:৪০

সাড়ে আট হাজার মাইল দূর থেকে আসা স্পেনের দল ‘লাস মিগাসের’ চার তরুণী শোনালেন ফ্ল্যামেনকোর চিরায়ত সুর। বাংলাদেশের সিলেটের কালনি নদী পাড়ের শাহ আবদুল করিমের গান শোনালেন বাউল কবির শাহ। পাটিয়ালা ঘরানার গান নিয়ে এসেছিরেন পাকিস্তানের শাফাকাত আমানাত আলী আর বাংলাদেশের অর্ণব মাতালেন ফোকের ফিউসন গেয়ে। মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারার এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা কেবল লোকসংগীতেরই রয়েছে। লোকসংগীতেই খুঁজে পাওয়া যায় আত্মার শান্তি ও ঐতিহ্যের সমৃদ্ধি। বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের লোকসংগীতের মুগ্ধতায় গতকাল শনিবার শেষ হলো তিন দিনের আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীতের উত্সবের চতুর্থ আসর।

সান কমিউনিকেশন্স এবং সান ফাউন্ডেশন- এর উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীতের এবারের উত্সবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭টি দেশ থেকে ১৭৪ জন লোকসংগীত শিল্পী অংশ নেন। আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্টের শেষ দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্পেনের চার তরুণীর ব্যান্ড ‘লাস মিগাসের’ পরিবেশনা। দলটি স্পেনের ফ্লেমেনকো আর মেডিটোরিয়ান ধারার সুরের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে তাদের গানে। গায়িকা বেগো সালাজার, গিটারিস্ট মারতা রবলেস, ভায়োলিন বাদক রোজার লসকস ও পারকাশানিস্ট তাবা ফ্লেমেনেকো, জ্যাজ সঙ্গীতে নিজস্ব ঢংয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাদের পরিবেশনা ঢাকার দর্শকদের সঙ্গীতের নতুন স্বাদ দিয়েছে।

গতকালের আরেক আকর্ষণ ছিল পাকিস্তানের শাফকাত আমানাত আলী। ওস্তাদ আমানাত আলী খাঁর পুত্র শাফকাত প্রথমে আলোচনায় আসেন তার ব্যান্ড ফিউজনের মাধ্যমে। ‘আখোঁ কি সাগার’, ‘খামাজ’, ‘তেরে বিনা’ গানগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়। পাটিয়ালা ঘরানার এই গায়ক পরে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক প্লেব্যাক করেছেন। ‘মিতওয়া’, ‘বিন তেরে’সহ অসংখ্যা জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন। ফোক ফেস্টের শেষ দিনে শেষ পারফর্মার হিসেবে তার জনপ্রিয় সব গান গেয়ে দর্শক মাতিয়ে তোলেন শাফকাত আমানাত আলী। এদের পাশাপাশি বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী অর্ণব মঞ্চ মাতিয়েছেন। শাফকাত আমানাত আলী’র গায়কীতে তার বাবা এবং চাচা ওস্তাদ ফতেহ্ আলী খান সাহেবের প্রভাব রয়েছে। সেই সাথে রোশনারা বেগমের গায়কী থেকে তিনি গানের অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকেন। শাফকাত আমানাত আলী সুফি এবং পাকিস্তানের লোকজ সংগীতের জন্য বিশ্বের সংগীত মহলে বেশ সমাদৃত।

গতকাল আরও সঙ্গীত পরিবেশন করে বাংলাদেশের বাউল কবির শাহ ও গানের দল নকশীকাঁথা। নকশীকাঁথা বাংলাদেশের ফিউসনধর্মী ফোক ব্যান্ড। দেশের লোক গানগুলোকে মঞ্চে পরিবেশন করছে দলটি। বর্তমানে এই ব্যান্ডে আছেন ভোকাল ও পারকেশনিস্ট সাজেদ ফাতেমী, কাহান, ঢোল ও ডিজ্যাম্বে-বুলবুল, অ্যাকুইসটিক গিটার, রাবাব ও দোতারা-সুমন, বেইজ গিটার-ফয়সাল, মেলোডিকা, অ্যাকোরডিয়ান-রোমেল। নকশীকাঁথা তাদের বেশ কিছু জনপ্রিয় গান শোনায়। তারা শুরু করেন - বন্দনা গীতি দিয়ে শুরু করে নকশীকাঁথা। সাঁওতালি গান ‘তুকে লিয়ে’, ‘ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে’, ‘নয়া বাড়ি লইয়ারে বাইদা লাগাইলো বাইগুন’, ‘জবর সুন্দরি কইন্যা জলে দিছো ঢেউ’সহ বেশকিছু গান গেয়ে শোনান।

এরপর মঞ্চে আসেন বাউল কবির শাহ্ বাংলা লোকজ সংগীতের এক অনন্য নাম। তার গায়কী দিয়ে তিনি দর্শকশ্রোতাদের মাতিয়ে রাখেন। তেরো বছর বয়স থেকে তার গানের চর্চা শুরু। বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের থেকে তার গানের হাতেখড়ি। বিচ্ছেদ ভাবের গান, ভাটিয়ালী, মুর্শীদি গানে পারদর্শী এই শিল্পী বাংলাদেশের গানের জগতে আশীর্বাদস্বরুপ। তিনি গেয়ে শোনান - ‘কে কয় পিরিত ভালা’, ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’, ‘দুই চাক্কায় দৌড়ে গাড়ি কি আর করবি মন’, ‘নাতিন তুমি কাইন্দ না জামাই লইন্ডনি’, ‘ভব সাগরের নাইয়া. মিছা গরব করো রে পরার ধন লইয়া’, কোন মেস্তরি নাও বানাইলো এমন দেখা যায় ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়’ ও ‘তোমার লাগি সাজাইয়াছি ফুলের বিছানা’।

এরপর মঞ্চে আসে স্পেনের বার্সেলোনার জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘লাস মিগাস’। এ দলের গানকে কেউ বলেন মেডিটেরিয়ান গান কেউবা বলেন আত্মার গান। ব্যান্ডটির সদস্যরা ভোকাল -বেগো সালাযার, গিটার - মারতা রোবলস, গিটার -আলিশিয়া গ্রিলো এবং ভায়োলিন- রসার লসকস। চার জনের ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা, মতাদর্শ এক করে তৈরি করেন তাদের মিউজিক যা শ্রোতাকে নিয়ে যায় এক নস্টালজিক, ইউফোরিক যাত্রায়। ২০১৭ সালে লাস মিগাসের অ্যালবাম ‘ভেন্তে কনমিগো’ ফ্লেমিংগো মিউজিক হিসেবে ১৮তম ল্যাটিন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়েছিল।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম শায়ান চৌধুরী অর্ণব। বন্ধুরা মিলে তৈরি করেন ‘বাংলা’ নামে জনপ্রিয় ব্যান্ড। জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা গানই অর্ণবকে জনপ্রিয় করে তোলে সাধারণ মানুষের মাঝে। গানের ভুবনে নিজস্বতা তৈরি করে অর্ণব সেই শুরু থেকেই দর্শকদের মুগ্ধ করে যাচ্ছেন। গতকালও তার ব্যতিক্রম হয়নি।