প্রকৌশলীকে শারীরিক লাঞ্ছনা, কীসের আলামত?

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:০২

দৈনিক ইত্তেফাকের এক রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, পাবনা গণপূর্ত বিভাগের এক প্রকৌশলীকে মারধর করিয়াছেন ঐ বিভাগেই ঠিকাদারি কাজ করা এক ব্যক্তি। তাহার উপর এই ঔদ্ধত্য তিনি দেখাইয়াছেন খোদ নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে। এই হেনস্তার শিকার উপবিভাগীয় সহকারী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার জানাইয়াছেন, মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশন নামক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বেশ কয়েকটি কাজ ঝুলাইয়া রাখিয়াছেন দীর্ঘদিন ধরিয়া। এই বিষয়েই নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে জরুরি বৈঠককালে তাহাকে কাজগুলি সমাপ্ত করিবার তাগিদ দিলে তিনি ক্ষিপ্ত হইয়া উঠেন! ইহা কীসের আলামত? ইহার মানে কী? একজন ঠিকাদার, তিনি যত প্রভাবশালীই হউন না কেন, যদি সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলেন, তাহাও আবার সরকারি অফিসেরই অভ্যন্তরে—তাহা হইলে আমাদের চিন্তা করিয়া দেখিতে হইবে আমরা কে, কোথায়, কতটা নিরাপদ রহিয়াছি। কেন গায়ে হাত তুলিয়াছেন, কীজন্য তুলিয়াছেন তাহা বিবেচ্য বিষয় নহে। কোনোক্রমেই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে সরকারি অফিসের মধ্যেই গায়ে হাত তুলিবার মতো ঔদ্ধত্য কেহ দেখাইতে পারেন না। পাবনার এই ঘটনা যদি বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা হইত, তাহা হইলে হয়তো আমরা ইহা তুলিয়া ধরিবার কথা ভাবিতাম না; কিন্তু ইহা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে। এইরূপ ঔদ্ধত্য আমরা চারিপাশে দেখিতে পাইতেছি। সরকারের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আইনকানুন মানিয়া, রুলস ফলো করিয়া কাজ করিতে পারিতেছেন না। সকল ক্ষেত্রেই এই নৈরাজ্য (দুই-একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকিলেও থাকিতে পারে) চলিতেছে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে।

আমরা দেখিতে পাই, যাহার সরকার থাকে, তিনি দেখিতে পান না বটতলা-তালতলায় কী ঘটিতেছে। ইহা তাহার জানিবার বা দেখিবার কথা নহে। তিনি তো আর ফিজিক্যালি বটতলা-তালতলা গিয়া বসিয়া থাকিতে পারেন না। দেশের প্রধান নির্বাহী যাহাকে দিয়া ইচ্ছা সরকার চালাইবেন। ইহা তাহার এক্তিয়ার। তিনি এখন আমলাদের যথেষ্ট প্রাধান্য দিতেছেন; কিন্তু অনেক কিছুই তাহার মতমতো ঘটিতেছে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটি রাষ্ট্রের ইনস্ট্রুমেন্ট হিসাবে কাজ করিয়া থাকেন। তাহাদের অনেকেরই ভুলভ্রান্তি হয়, তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ অনিয়ম ও দুর্নীতি করিয়া থাকেন। সেই ক্ষেত্রে তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনিবার ব্যবস্থা রহিয়াছে; কিন্তু কোনোক্রমেই চড়াও হওয়াটাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ছোট করিয়া দেখিবেন না বলিয়াই আমরা বিশ্বাস করি। 

উন্নয়নশীল বিশ্বের এই যে সমস্যা এই সমস্যাগুলির সমাধান না হইলে কোন ঘাটের পানি কোন ঘাটে গিয়া পড়ে তাহা কেহই জানেন না। সুতরাং এই সমস্যাগুলি কঠিন হস্তে সমাধান করা প্রয়োজন। এইভাবে চলিতে পারে না। মনে রাখিতে হইবে, বাড়াবাড়ি এমন এক বিষয় ইহা যাহারা করেন তাহাদের কোনো মাত্রাজ্ঞান থাকে না। আমরা যখন ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ছিলাম তখন এত দপ্তর, মহাদপ্তর, পরিদপ্তর ছিল না। সেই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল, জনগণের মধ্যে অসন্তোষও ছিল। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্রিটিশ লাটদের উপর অনেক হামলার ঘটনাও ঘটিয়াছে; কিন্তু নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে কেহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর আঘাত করিবার কথা কল্পনাও করিত না। আর ঔপনিবেশিক শাসকরাও অনেক বিষয়ে আপসে গেলেও সরকারি কর্মচারীর প্রতি সহিংসতা কোনোক্রমেই সহ্য করিত না। ফলে ব্রিটিশরা স্থায়ী একটি মজবুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে পারিয়াছে। সুতরাং পাবনার যে ঘটনা ঘটিয়াছে তাহাতে সরকারের যে শক্তি আছে সকল লইয়া ঝাঁপাইয়া পড়িয়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। ইহা দেশের বর্তমানের এবং ভবিষ্যতের স্বার্থেই প্রয়োজন।