এবার আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের স্লোগান বা প্রতিপাদ্য হচ্ছে—‘Literacy for a human-centred recovery: Narrowing the digital divide.’ (মানবকেন্দ্রিক মুক্তিলাভের জন্য সাক্ষরতা: ডিজিটাল বিভক্তিকে কমিয়ে আনা)। বিশ্বব্যাপী শিশু, যুবক ও বয়স্কদের শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে কোভিড-১৯-এর কারণে। সাক্ষরতা ও শিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্যকে প্রকটতর করেছে এই কোভিড মহামারি। ৭৭৩ মিলিয়ন নিরক্ষর জনগণের জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। বহু দেশই কোভিড-১৯ মোকাবিলা করার জন্য যেসব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তার মধ্যে নিরক্ষরদের জন্য কোন ধরনের ব্যবস্থা, সাক্ষরতা ধরে রাখা কিংবা সাক্ষরতা ভুলে না যাওয়ার জন্য কোনো ধরনের পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে অসংখ্য সাক্ষরতা কর্মসূচি কাজ করা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এটি সত্য যে, প্রথমে আক্রান্ত মানুষকে বাঁচাতে হবে, যারা সুস্থ আছে তারা যাতে আক্রান্ত না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা নিজেরা আক্রান্ত না হয়, অন্যদের আক্রান্ত না করে। দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। রাজনীতির তাগিদে গরিব রাষ্ট্রগুলোও তাদের জনগণকে কিছু দিয়েছে কিন্তু সেটি তো সমুদ্রের কাছে গোষ্পদের মতো। তবে এটিও সত্য যে, সব দরিদ্র দেশই প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থের অযথাই অপচয় করে চলেছে। এসব কারণে শিক্ষার এবং শিক্ষার মার্জিনাল পয়েন্ট অর্থাত্ সাক্ষরতার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। যাদের অবস্থান সাক্ষরতার বহু ওপরে ছিল গত ১৭-১৮ মাসে তাদের অনেকেই সেই যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে, অর্থাত্—নিরক্ষতার কাতারে শামিল হয়েছে। আমি নিজে আগস্টের ৩০ তারিখ থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রংপুর গাইবান্ধার বিভিন্ন বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অবস্থা জানার জন্য বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছি। শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিষয় লিখতে যখন বলা হলো, দেখলাম—যে লেখা তাদের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লেখার কথা, তা লিখতে কয়েক মিনিট লগিয়ে দিচ্ছে, তার পরও লিখতে পারছে না। আমি নিজে বুঝলাম এবং সংশ্লিষ্টরাও বলল যে, এতদিন লেখার অভ্যাস নেই বলে এই অবস্থা হয়েছে। এটি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা।
বৈশ্বিক এই মহামারিকালে বিকল্প উপায়ে লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্নভাবে—দূরশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হযেছে, মাঝে মাঝে ব্যক্তি উপস্থিতির সঙ্গে ডিজিটাল লার্নিংও পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু সাক্ষরতার জন্য এজাতীয় কর্মসূচি সেভাবে পালন করা হয়নি। দ্রুত দূর শিক্ষণ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে ডিজিটাল বিভক্তি প্রকট আকার ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে যে বৈষম্য নিয়ে বিষয়টি এগোচ্ছিল, সেটি আরো ত্বরান্বিত হয়েছে। এই বিভক্তি কমানোর দায়িত্ব কার হাতে এবং কীভাবে কমাতে হবে, সেটি নিয়ে ভাবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এবারকার স্লোগানে সে কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। তবে, এর মধ্যেও সুখবর হচ্ছে বিভিন্ন বয়সের বিশাল এক জনগোষ্ঠী দ্রুততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক ভার্চুয়াল জগত্ যে জগতের সঙ্গে আমাদের, দরিদ্র মানুষের সে ধরনের পরিচিতি অর্থাত্ সাক্ষরতা ছিলই না। যারা এর সঙ্গে তাল এখনো মেলাতে পারেনি, তারা ডিজিটালি নিরক্ষর, ডিজিটাল সাক্ষরতা থেকে দূরে থেকেছে। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় যারা এই আধুনিক ডিভাইসগুলোর সঙ্গে পরিচিত নয়, ব্যবহার করতে হিমশিম খাচ্ছে কিংবা ব্যবহার করতে পারছে না, তারা সবাই ডিজিটালি নিরক্ষর।
কোভিড মহামারি সাক্ষরতার গুরুত্বকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এর আত্মিক গুরুত্বের বাইরেও শিক্ষা এবং সাক্ষরতা অধিকার হিসেবে মানুষকে ক্ষমতায়িত করে, জীবনমান বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং এটি টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি। ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস মানবকেন্দ্রিক পুনরুদ্ধারের শক্ত ভিত গড়তে অবদান রাখবে। সাক্ষরতা ও ডিজিটাল দক্ষতা এখন প্রয়োজন নিরক্ষর যুবক ও তরুণদের। এটি আরো আবিষ্কার করবে যে টেকনোলজি-সমৃদ্ধ সাক্ষরতা কাউকে বাদ দিয়ে নয়। ২০২১ সালের সাক্ষরতা দিবস একটি সুযোগ, যা ভবিষ্যত্ সাক্ষরতাকে পুনরায় ভাবতে শেখাবে, সাক্ষরতার পুরাতন সংজ্ঞাকে প্রতিস্থাপিত করবে। ১৯৬৫ সালে তেহরানে অনুষ্ঠিতব্য শিক্ষামন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলেনে সাক্ষরতা দিবসের জন্ম হয়। ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর ইউনেসকো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের। এ সময়ে বিশ্ব কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যেমন—নিরক্ষরতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা। শিক্ষার ওপরেই গুরুত্বটা দেওয়া হয়েছিল এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের ওপর যাতে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়। সাক্ষরতা হচ্ছে সেই সোনালি অস্ত্র, যার মাধ্যমে একজন মানুষের ক্ষমতায়ন ঘটে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য অর্জিত হয়। নাম লিখতে পারার, নিজের সম্পর্কে লিখতে পারার মধ্যে সাক্ষরতা আর আটকে নেই। ডিজিটাল সভ্যতার এই যুগে সাক্ষরতাকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, তা না হলে বৈশ্বিক অগ্রগতি সমতালে তো নয়ই বরং বহু ব্যবধান নিয়ে এগোবে। ডিজিটালি পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে তাদের একটি রিপোর্টে দেখিয়েছিল যে, ঐ বছর প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৮.৪ শতাংশ এবং যেসব শিশু কখনই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি কিংবা যায়নি তাদের হার প্রায় ২ শতাংশ। এই হারের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়েছে যে, সারা দেশে ৮-১৪ বছর বয়সি প্রায় ২.৮ মিলিয়ন শিশু রয়েছে, যারা বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছে অর্থাত্ এই অপার সম্ভাবনাময় শিশুরা নিরক্ষর। সরকার যদিও বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে দারিদ্র্যের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হয় কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি কিংবা কখনো প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রোগ্রাম (পিইডিপি-৪)-এর আওতায় ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন প্রোগ্রাম’ এসব শিশুকে দ্বিতীয় সুযোগ হিসেবে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছে এবং এটি ২০২১ জানুয়ারি মাসে প্রথম বারে আট থেকে ১৪ বছর বয়সি ৫ লাখ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার কথা। সে কাজটি কিন্তু সেভাবে এগোয়নি এই করোনার কারণে। এই উদ্দেশ্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর এনজিওদের সহায়তায় সারা দেশে ৩২ হাজারেরও বেশি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করার কথা। বর্তমানে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো দেশের ছয়টি জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা, সিলেট ও সুনামগঞ্জে পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে চালাচ্ছে ১ লাখ শিক্ষার্থীদের জন্য। এই পাইলট প্রজেক্ট শেষ হতে যাচ্ছে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। তবে, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক বিদ্যালযে ভর্তির কারণে এটি হয়তো মার্চ ২০২২ পর্যন্ত গড়াবে। তাতে কি আমরা এই শিশু শিক্ষার্থীদের ডিজিটালি সাক্ষর করতে পারব? প্রায় দুই বছর এসব শিশু বইয়ের সংস্পর্শে থাকতে পারেনি।
আমাদের দেশের অসহায় ও বঞ্চিত পথশিশুদের জন্য রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পের আওতায় দেড় শতাধিক উপজেলায় ২২ হাজারেরও বেশি আনন্দ স্কুলে মোট ৬ লাখ ২৪ হাজার ১০৪ জন পথশিশু শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের অনেক স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৮ মাসের করোনাকালীন বন্ধে এসব আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। এই যোগাযোগ না থাকার অর্থ হচ্ছে এখানকার শিশুরা যতটুকু সাক্ষরতা অর্জন করেছিল চর্চার অভাবে তা ভুলে গেছে। অবস্থা স্বাভাবিক হলে এসব শিশুর কত শতাংশ পড়াশোনায় ফিরে আসবে, তা সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। আবার যারা আসবে তারাও যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে এবং পড়াশোনা বুঝবে তাও কিন্তু নয়। তাদের জন্য প্রয়োজন হবে বিশেষ ব্যবস্থা, যা হারিয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া পড়া ও লেখার দক্ষতা উদ্ধার হওয়ার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কি সে ধরনের কোনো ব্যবস্থার কথা শুনছি বা দেখছি?
পথশিশু হওয়ার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ কিংবা মৃত্যু, অর্থলোভী কিছু মাদক ব্যবসায়ীর নিষ্ঠুর নজর। চরাঞ্চল নদীভাঙন, বন্যা কিংবা সাইক্লোন-ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহারা মানুষের একটি বড় অংশ আশ্রয় নেয় শহরের বস্তিগুলোয়। এসব পরিবারের শিশুরা নানা ধরনের অদক্ষ শ্রমিক ও শিশুশ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়, যেখানে মেলে নির্যাতন, বৈষম্য, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট। ফলে, তারা অনেক অসামাজিক কার্যকলাপেও জড়িয়ে পড়ে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসেবে পথশিশুদের ৫১ শতাংশ অশ্লীল কথা বলে, ২০ শতাংশ শারীরিক এবং ১৪.৫ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পথশিশুদের ৮২ শতাংশ নানা ধরনের পেটের অসুখে এবং ৬১ শতাংশ কোনো না কোন চর্মরোগে আক্রান্ত। এই বিপুলসংখ্যক শিশু, যাদের থাকার স্থায়ী জায়গা নেই, নেই বাবা-মায়ের কোনো খোঁজখবর, তারা নেই বিদ্যালয়ে, কে কোথায় কেমন আছে নেই তার কোনো খবর। এটি একটি বিশাল সামাজিক অনাচার।
n লেখক :শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)
