কুমিল্লায় বৃদ্ধ দম্পতি হত্যা :পুত্রবধূসহ তিন ঘাতকের স্বীকারোক্তি

শ্বাসরোধে হত্যার পর তারা ডাকাতির নাটক সাজায়

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:১৩

কুমিল্লায় চাঞ্চল্যকর জোড়াখুনের (পল্লি চিকিত্সক সৈয়দ বিল্লাল হোসেন ও তার স্ত্রী সফুরা খাতুন) ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উদ্ঘাটনসহ তিন ঘাতককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ কিলিং মিশনে অংশ নেয় নিহত দম্পতির পুত্রবধূসহ তিন জন। তারা সকলেই হত্যার দায় স্বীকার করে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে। পারিবারিক কলহের জের ধরে পুত্রবধূ শিউলি অপর দুজনের সহায়তায় শ্বশুর-শাশুড়ির হাত-পা বেঁধে তাদের শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার পর ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করে ডাকাতির নাটক সাজায়। মঙ্গলবার তাদেরকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশ সুপার কার্যালয়ে গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী আবদুর রহীম।

গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে—নিহত দম্পতির দুবাই প্রবাসী ছেলে সৈয়দ আমান উল্লাহর স্ত্রী নাজমুন নাহার চৌধুরী ওরফে শিউলী (২৫), তার খালাতো ভাই জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের আবদুর রহিম মজুমদারের ছেলে জহিরুল ইসলাম মজুমদার ওরফে সানি (১৯) এবং তার বন্ধু লালমাই উপজেলার দক্ষিণ জয়কামতা গ্রামের মো. শাহাবুদ্দিনের ছেলে মেহেদী হাসান ওরফে তুহিন (১৮)। তাদেরকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার জন্য দুপুরে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে প্রেরণ করা হলেও সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জবানবন্দি গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছিল বলে জানা গেছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানানো হয়, শিউলীর স্বামী সৈয়দ আমান উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে দুবাই প্রবাসে অবস্থান করছেন। তিনি বাড়িতে তার বাবা-মায়ের নামে টাকা প্রেরণ করতেন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্যসহ পরিবারে কলহের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে শিউলী তার শ্বশুর-শাশুড়িকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে আসছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত রবিবার রাত ৮টার দিকে শিউলী তার খালাতো ভাই সানিকে কয়েক জন বন্ধুসহ তার শ্বশুর বাড়িতে আসার জন্য বলে। রাত ৯টার দিকে সানি তার বন্ধু তুহিনকে সঙ্গে নিয়ে শিউলীর শ্বশুর বাড়িতে যায়। এদিন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টিভেজা রাতে শিউলী তার শ্বশুরের টিনশেড বিল্ডিংয়ের কলাপসিবল গেট ও ঘরের দরজা খুলে সানি ও তুহিনকে ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই শিউলী পেছন থেকে ওড়না দিয়ে বৃদ্ধা শ্বাশুরির মুখ চেপে ধরে এবং সানি ও তুহিনকে হাত-পা বাঁধার জন্য বলে। একপর্যায়ে শিউলী তাকে বিছানায় ফেলে কম্বল দিয়ে মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধে শ্বাশুরির মৃত্যু নিশ্চিত করে। এর কিছুক্ষণ পর তার শ্বশুর পল্লি চিকিত্সক সৈয়দ বিল্লাল হোসেন সুবর্ণপুর বাজারের চেম্বার থেকে ঘরে ফিরলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিউলী একই কায়দায় শ্বশুরের মুখ চেপে ধরে বিছানায় শুইয়ে ফেলে কম্বল চাপা দেয়। এসময় সানি ও তুহিন তার হাত-পা বেঁধে ফেলে। একসময় মারা যান বৃদ্ধ বিল্লাল। প্রেস ব্রিফিংয়ে আরো বলা হয়, ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য ঘাতকরা ঘরের আসবাবপত্র ও কাপড়-চোপড় তছনছ করে মেঝেতে ফেলে রাখে এবং নিহতদের ব্যবহূত দুটি মোবাইল ফোন ও ঘরের বিভিন্ন চাবি পার্শ্ববর্তী ডোবায় ফেলে দেয়। পরে ডাকাতির নাটক সাজানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে শিউলীর হাত-পা ও মুখ বেঁধে তাকে ঘরে ফেলে রেখে সানি ও তুহিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে বের হয়ে যায়। এরপর শিউলী মুখের বাঁধন খুলে ডাকাতি হয়েছে বলে চিত্কার শুরু করলে বাড়ির লোকজন জড়ো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ রাতেই ঐ দম্পতির বাড়িতে গিয়ে লাশ দুটি উদ্ধার করে এবং শিউলীকে আটক করে সোমবার ভোরে থানায় নিয়ে যান। এদিন বিকালে নিহতদের মেয়ে বিলকিস বেগম বাদী হয়ে শিউলীকে এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা আরো দুই-তিন জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। পুলিশ শিউলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সোমবার রাতভর অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তার খালাতো ভাই জহিরুল ইসলাম মজুমদার সানিকে কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ চর্থা এলাকা থেকে ও তার বন্ধু মেহেদী হাসান তুহিনকে বরুড়া উপজেলার আড্ডা বাজার থেকে গ্রেফতার করে। সানির সঙ্গে শিউলীর পরকীয়ার বিষয়টিও পুলিশ খতিয়ে দেখছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী আবদুর রহীম আরো জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা পুলিশের নিকট দুই জনকে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার জন্য তাদেরকে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। গত রবিবার দিবাগত রাতে সুবর্ণপুর গ্রামে বৃদ্ধ দম্পতির হত্যার ঘটনা ঘটে। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দুটি প্রবাসী দুই ছেলে দেশে আসার অপেক্ষায় দাফনের জন্য ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে বাড়িতে রাখা হয়েছে। তারা দেশে না ফেরায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের দাফন হয়নি বলে জানান মামলার বাদী বিলকিস বেগম।