আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসার তিন সপ্তাহ পর তালেবান এক নতুন অন্তর্বতী সরকারের নাম ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে আফগানিস্তানকে ‘ইসলামি আমিরাত’ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঘোষিত এই নতুন সরকারে অন্তর্বতী প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে মোল্লাহ মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে। তার উপ-প্রধান হিসাবে কাজ করবেন তালেবান গোষ্ঠীর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লাহ আব্দুল ঘানি বারাদার। আর ২০১৬ সাল থেকে তালেবান গোষ্ঠীর অন্যতম উপনেতা মোল্লাহ ইয়াকুব ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। গতকাল কাবুলে বড় ধরনের বিক্ষোভের মধ্যেই সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই সরকারকে কট্টরপন্থি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। খবর বিবিসি ও সিএনএনের
তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা জানি আমাদের দেশের মানুষ নতুন সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে।’ অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিচিত হলেও দীর্ঘদিন ধরেই দলটির রাজনীতিতে যুক্ত রয়েছেন মোল্লাহ হাসান আখুন্দ। তালেবানের আগের সরকারেও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জাতিসংঘের সন্ত্রাসী তালিকাতেও তার নাম আছে। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি তালেবানের নেতৃত্বদানকারী কাউন্সিল ‘রাহবারি সুরা’ প্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানান, অন্তর্বতী সরকারের ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। হাক্কানি নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকায় আছে। সিরাজুদ্দিন হাক্কানিও এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছেন। অন্য নিয়োগের মধ্যে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লাহ ইয়াকুব যিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লাহ ওমরের ছেলে। ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে আছেন আব্বাস এস্তানজেকাই। এছাড়া দ্বিতীয় উপনেতা থাকবেন মোল্লাহ আবদুল সালাম হানাফি। তালেবানের যে ক’জন কর্মকর্তা কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছেন ঘানি বারাদার তাদের মধ্যে অন্যতম। ঘোষণা না করা হলেও জানা গেছে, হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা হচ্ছেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধানের কাবুল সফরের সময় সরকার গঠন নিয়ে একটা সমঝোতা হয়েছে। মুজাহিদ বলেন, নতুন সরকারে প্রথম কাজগুলোর মধ্যে থাকবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া এবং দেশটিতে ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকট মোকাবিলা করা।
বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে তালেবানের ফাঁকা গুলি
কাবুলে তালেবানবিরোধী একটি বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে তাদের যোদ্ধারা ফাঁকা গুলি ছুঁড়েছে। গোলাগুলির শব্দে আতংকিত লোকজন এদিক ওদিক পালায়। তালেবান শাসনের প্রতিবাদ, নারীদের অধিকার দাবি এবং তথাকথিত পাকিস্তানি হস্তক্ষেপের নিন্দা জানাতে কয়েকশ’ লোক এ বিক্ষোভে যোগ দেন। আফগানিস্তানে তালেবান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত তাদের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করে যত বিক্ষোভ হয়েছে তার মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে বড়। তালেবান শাসনের মধ্যেই শত শত বিক্ষোভকারী জড়ো হয়েছিলেন কাবুল শহরে। গত সপ্তাহে কাবুলে একদল নারী বিক্ষোভ করেছিলেন, তবে মঙ্গলবার নারীদের সাম্য ও নিরাপত্তার দাবি নিয়ে বিক্ষোভে পুরুষরাও যোগ দেন। কিছু বিক্ষোভকারী ‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ’ বলে ধ্বনি দেয়।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করছে যে ইসলামাবাদের সরকার তালেবান যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে এবং পাকিস্তানের বিমানবাহিনী পাঞ্জশিরে তালেবানবিরোধীদের ওপর বোমা ফেলেছে, যদিও পাকিস্তান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিবিসির সংবাদদাতা সিকান্দার কেরমানি জানান, কিছুদিন আগে পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান কাবুল সফর করায় আফগানিস্তানে অনেকেই আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বিক্ষোভে আসা একজন আফগান তরুণী বলেন, ‘আমরা মৃত্যুকে ভয় করি না, আমরা বাক-স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র চাই।’ টোলো নামের একটি আফগান টিভি চ্যানেল বলছে, তাদের একজন ক্যামেরাম্যানকে আটক করা হয়েছে।
ক্লাসে ছেলে-মেয়ে আলাদা
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে আফগানিস্তানের বড় তিন শহর কাবুল, কান্দাহার আর হেরাতের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীরা জানান, কয়েক দিনের বিরতির পর ধীরে ধীরে আবার ক্লাস শুরু হচ্ছে। তবে এখন ছাত্র-ছাত্রীরা পাশাপাশি বসে ক্লাস করতে পারছে না। কয়েকদিন আগেও যেখানে ছেলে আর মেয়ে পাশাপাশি বসেছেন, এখন তাদের বসতে হচ্ছে আলাদা। মাঝে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে পর্দা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়েদের এভাবে আলাদা বসতে তালেবান নির্দেশ দিয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।
আফগানদের দেশ ত্যাগের অনুমতি
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যান্টনি ব্লিনকেন বলছেন, তিনি তালেবানের কাছ থেকে নিশ্চয়তা পেয়েছেন যে যারা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যেতে যেতে চায়, তাদের সঙ্গে উপযুক্ত কাগজপত্র থাকলে তাদের যেতে দেওয়া হবে। ব্লিনকেন কাতারে রয়েছেন এবং আফগানিস্তান থেকে লোকজনকে সরিয়ে আনার কাজে কাতারি সরকার যে ভূমিকা রেখেছে, তিনি তার প্রশংসা করেছেন।
