আজ থেকে ৭০-৮০ বছর আগেও ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর এলাকার বিভিন্ন বনে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াত ময়ূর। আশির দশকের গোড়ার দিকে প্রাকৃতিকভাবে গাজীপুরের শ্রীপুরের শালবনে শেষ ভারতীয় ময়ূরের দল দেখা গেছে এবং একসময় চট্টগ্রাম আর পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন অরণ্য ছিল বার্মিজ ময়ূরের বাসস্থল। খুব সম্ভবত এরাও বিলুপ্ত হয়েছে। তাই বাংলাদেশের প্রকৃতিতে এই সুন্দর পাখিটি এখন আর দেখা যায় না। বাংলাদেশের খুলনা শহরের উত্তর-পশ্চিমাংশের গল্লামারীতে অবস্থিত ময়ূর নদীতে তলানি জমতে জমতে কালের পরিক্রমায় এখন মৃতপ্রায়, ঠিক একইভাবে আমরা অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে ফেলেছি রঙিন ও সুন্দর পাখি ময়ূরকে।
পক্ষীবিজ্ঞানের ভাষায় ময়ূর আসলে ফিজিয়ানিডি গোত্রের পাভো বর্গের অন্তর্ভুক্ত ফিজ্যান্ট জাতীয় বড়, চমত্কার ও আকর্ষণীয় রঙের পাখি। এই উপমহাদেশের অনেক দেশে নীল ময়ূর সহজেই মানুষের সাহচর্যে বাস করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়াও ময়ূর ইউরোপের অনেক দেশের পার্কেই হরহামেশা দেখা যায়। তবে সবুজ ময়ূর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্যতম বিপন্ন এক পাখি। ১৯৩৬ সালে জে. পি চ্যাপিন মধ্য আফ্রিকার জায়ারের নিরক্ষীয় মৌসুমি বনাঞ্চল থেকে প্রথম কঙ্গোময়ূরের বর্ণনা দেন। ময়ূর জাতীয় সব পাখির নিবাস এশিয়ায় হলেও এই ময়ূর কীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে আফ্রিকায় বসবাস শুরু করেছে তা এখনো রহস্য হয়ে আছে! এসব ময়ূরের পাশাপাশি সাদা ময়ূরও দেখা যায়। এদের দেহ সাদা, তবে চোখ নীল। প্রকৃতপক্ষে নীল ময়ূরই সাদা ময়ূর, জিনগত মিউটেশনের কারণে এদের এমনটি দেখায়।
সাধারণত পুরুষ ময়ূরের মাথায় মুকুট থাকে, মাথার দুপাশ সাদাটে ও পালক বিহীন। পালক অসাধারণ উজ্জ্বল, ধাতব আভাযুক্ত সবুজ ও নীল রঙের। লেজের উপরিভাগের পালকগুলি অতিশয় লম্বা; পেখম মেললে এর দৈর্ঘ্য এক মিটারেরও বেশি। তামাটে-সবুজ ও নীল রঙের সংমিশ্রণে সজ্জিত চওড়া পালকে থাকে রঙিন চোখের মতো বড় বড় ফোঁটা। স্ত্রী ময়ূরকে আকৃষ্ট করার জন্য পুরুষ ময়ূর পেখম মেলে। এ কারণেই এরা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। লেজের পালকসহ পুরুষ ময়ূরের দৈর্ঘ্য হতে পারে ২-২.২৫ মিটার, স্ত্রী পাখি লম্বায় হয় প্রায় ৮৬ সেন্টিমিটার। স্ত্রী ময়ূরেরও মাথায় মুকুট থাকে, তবে পেখম মেলার মতো লেজে উজ্জ্বল লম্বা পালক নেই। এদের মাথা ও ঘাড় হালকা বাদামি, দেহের ওপরের অংশ বাদামি। ঘাড়ের নিচের অংশ নীল রঙের নয়, উজ্জ্বল সবুজ। পেট সাদা, কিছুটা হলুদ আভাযুক্ত। সাধারণত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এদের প্রজননকাল, তবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরেও এদের প্রজনন ঘটে। স্ত্রী ময়ূর সাধারণত ফোঁটা ফোঁটা দাগবিশিষ্ট ৪ থেকে ৬টি ডিম পাড়ে। বাচ্চা ফুটতে সময় লাগে ২৬ থেকে ২৮ দিন। বাচ্চাগুলো মুরগির বাচ্চার মতোই মায়ের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে খাবার খায়। বিপদ দেখলেই মায়ের ডানার নিচে এসে লুকায়। ছোট বাচ্চারা মুরগির বাচ্চার মতোই মায়ের পালকের আড়ালে, আবার কখনোবা পিঠের ওপর লাফিয়ে উঠে খেলা করে। ময়ূরের সব প্রজাতি সাধারণত বনে বাস করে এবং মাটিতে বাসা বাঁধে। তবে মাঝে মাঝে লোকালয়েও দেখা যায়। বিশেষ করে সংরক্ষিত এলাকায় এরা মানুষের খুব কাছে চলে আসে। এরা সর্বভূক, আর তাই চারা গাছের অংশ, কীটপতঙ্গ, বীজের খোসা, ফুলের পাপড়ি এবং ছোট ছোট সন্ধিপদ প্রাণী খেয়ে থাকে।
বিশাল রঙিন পেখমযুক্ত ময়ূর যে কারো দৃষ্টি কেড়ে নেয়। রঙের বিন্যাস, সৌন্দর্য এবং চালচলনের আভিজাত্য একে সবার থেকে আলাদা করে। তাই শিল্পীর ক্যানভাসে, কবির কবিতার খাতায় ময়ূর হয়ে ওঠে ভীষণ নান্দনিক। এমনকি হিন্দুধর্মের পুরাণ-শাস্ত্রে ময়ূরকে এক পবিত্র ও শোভাময় পুরনো পাখি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ময়ূরের পালককে মঙ্গলের চিহ্ন হিসেবে মনে করা হয়। এক সময় সাজ-সজ্জা ও অলঙ্করণের কাজে প্রচুর ময়ূরের পালক এ উপমহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে রপ্তানি করা হতো।
