তানভীর তারেক
ঠিক কোন পথে এগুচ্ছে মিউজিক ইন্ডাষ্ট্রি? আদৌ কী এগুচ্ছে? না পেছাচ্ছে! সেও এক শংকার বিষয়। এরপরও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন ডিজিটালি ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন ভার্চুয়াল অ্যাপ এ গানের বিপণন করছেন।
এর ভেতরে গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীদের সমন্বিত প্রয়াসে সম্প্রতি গানের রয়্যালিটির সুষ্ঠু বন্টনের একটি নীতিমালা তৈরি হয়েছে। এই উদ্যোগে গানের সকল বিভাগ অর্থাত্ গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও প্রকাশক সকলেই অংশীদার ভিত্তিতে তাদের নায্য রয়্যালিটি ভাগ করে নিতে পারবেন।
তবুও গানের বিপনণে কী প্রকাশকরা খুব বেশি আগ্রহী হতে পেরেছেন? এমন প্রশ্নে যখন প্রকাশকদের প্রশ্ন করা হয়, তখন হতাশার কথাই শুনতে পাওয়া যায়। যদিও প্রকাশকদের মুখে ইন্ডাষ্ট্রির হতাশার প্রলাপ খুব পুরণো অভ্যেসের মতো। তবে এ সময়ের সংকটটা একেবারেই আলাদা। কারণ একটি মিউজিক ভিডিওর বাজেটে এখন প্রকাশকরা একটি সিঙ্গল নাটক নির্মাণে বেশি আগ্রহী! তাই দূর্মুল্যের বাজারে এত এত বাজেটের মিউজিক ভিডিও এখন শখের শিল্পী ছাড়া কারো সামর্থেও কুলায় না।
প্রসঙ্গতই, এখন অডিও প্রকাশকরা ঝুঁকছেন নাটক বা ভিন্ন ভিন্ন কনটেন্ট নির্মাণে। ফলে মূল মুনাফা আয়ের পথ এখন অধিকাংশ কোম্পানিরই গানের বাইরে বিনোদনমূলক কন্টেন্ট নির্মাণের ওপরে।
এ প্রসঙ্গে ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের কর্নধার কণ্ঠশিল্পী ধ্রুব গুহ বলেন, ‘আমি গানকে কখনওই বাণিজ্যের সাথে মিশাইনি। বরাবরই বলে এসেছি গানের ক্ষেত্রে কোনো শিল্পীর সম্মানী আর্থিক মূল্যে পরিশোধ করা সম্ভব না। গানকে আমি ঐ শ্রদ্ধার আসনেই রাখি। আমি অন্তত গত কয়েকমাসের খসড়ায় দেখাতে পারবো, অনেক বাজার চলতি গানের ওপর নির্ভর না করে সুস্থ ধারার মিউজিককে নিয়মিত প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। এখন এসব ক্ষেত্রে ভিউ গুনে আমি গানের মান নির্ণয় করতে চাই না। নূন্যতম নীতিবোধ থেকেই এই কাজগুলো করছি আমরা। এরপরও সমন্বিত যে কোনো সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। কারণ রয়্যালিটির ক্ষেত্রে কারো সাথেই আমাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। হ্যাঁ, এখন আমরা অনেকেই নিয়মিত নাটক, ওয়েব সিরিজ প্রডিউস করছি। এটা কিন্তু ডিভিডি আমলেও ছিল। এখন তারই ধারাবাহিকতায় আমরা নিজেরা টিম নিয়ে তা প্রকাশ করছি। আমি বলবো একটি প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য এটুকুও জরুরি। আর এখানেও যদি নীতিমালা বহির্ভূত কোনো চর্চা হয়, তবে তার জন্য রাষ্ট্রীয় আইন রয়েছে। তাই আমি মনে করি, প্রকাশনীতেও ভাল মন্দ উভয়ই আছে, সেক্ষেত্রে ভাল কাজকে প্রমোট করা উচিত আমাদের সকলের, তবেই মানহীন কাজের দমন সম্ভব।’ উল্লেখ্য, ডিভিডির যুগ থেকেই মূলত অডিও প্রকাশকরা নাটক, সিনেমার বিপণন করে আসছে। তবে ইউটিউব যুগে প্রকাশকদের অনেকেই নিজেরাই নাটক নির্মাণ ও প্রকাশ প্রচারণা করছেন।
দেশের ঐতিহ্যবাহী অডিও প্রকাশক সাউন্ডটেকের কর্ণধার সুলতান মাহমুদ বাবুল বলেন, ‘এই ইন্ডাষ্ট্রিকেই তো আমরাই দাঁড় করিয়েছি। আমি বরাবরই বলে আসছি সম্মিলিতভাবে যে সিদ্ধান্ত হবে তার প্রতি সমর্থন আমাদের সবসময় ছিল এবং থাকবে। এর আগে সঙ্গীত শিল্পীরা বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন ছিলেন। এখন সুুসংগঠিত হয়েছেন। সেক্ষেত্রে আমরাও এত এত শিল্পীদের পেছনে লগ্নি করে যে ইন্ডাষ্ট্রি দাঁড় করিয়েছি, সেটিও নিশ্চয়ই তারা বিবেচনা করবেন।’
অডিও প্রকাশকদের বাইরে অ্যাপ নির্ভর গানের বিপণনের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় স্বাধীন মিউজিক। সমসাময়িক মিউজিক ইন্ডাষ্ট্রি প্রসঙ্গে স্বাধীন মিউজিকের প্রধান নির্বাহী সাবিরুল হক বলেন, ‘আমার মনে হয় এটিকে আমরা পরিবার ভাবলেই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারি। স্বাধীন মিউজিকে আমরা সবসময়ই লিগ্যাল রাইটস নিয়ে কাজ করি। কোনো গান আপ করার আগে সবার অনুমতি এবং পরস্পরের অনাপত্তিপত্র নিয়েই সেটা প্রকাশ করি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো বেশ কিছু কাজের ক্ষেত্রে আমরা নিজেরাও দেখেছি এই পারস্পরিক সমন্বয়ের বড় অভাব। আমি মনে করি সম্মিলিত সংগঠনের এখনকার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেখানে এই দুরত্বগুলো ঘুচে যাবে।’
তবে এটা অপ্রিয় বাস্তবতা যে, গানের বিপণন-এর চেয়ে অধিকাংশ প্রকাশক এখন বিভিন্ন কন্টেন্ট-এর দিকেই আগ্রহী হচ্ছেন। এর একটি কারণ হলো তড়িত্ মুনাফা। কারণ এক্ষেত্রে একটি গানের শিল্পী সুরকার থেকে শুরু করে অডিওর পাশাপাশি গানটির মিউজিক ভিডিওতে লগ্নি করার পর সেই গান থেকে যে রেভিনিউ পাচ্ছে প্রকাশকরা তা খুবই হতাশাজনক। অন্যদিকে জনপ্রিয় একটি সিরিজ বা সিঙ্গল নাটক থেকে নানান ভাবেই তার ছোট ছোট কন্টেন্টে রেভিনিউ আসে। এমনকি নাটকের গান থেকে আলাদা ভাবে একটি মৌলিক গানের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বেশি রেভিনিউ পাচ্ছে প্রকাশকরা। এসব বাস্তবতার দায়ে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় মুনাফার দিকেই ছুটতে হচ্ছে প্রকাশকদেরকেও।
