ধ্রুবক
মাঝে মাঝে আমি হেঁটে বেড়াই বিষণ্ন মানুষের ছায়াসঙ্গী হয়ে, যারা বিরহে বেঁচে থাকে। একটা প্রজন্ম থাকে, যারা হয়তো পালে হাওয়া পেলেই চলতে পারে। আমি কেন জানি এদের সঙ্গে জীবনযুদ্ধে পেরে উঠতে পারি না। আমি নিজ গন্তব্য থেকে অনেক দূরে থাকা অবস্থাতেই কতজনকে যে বিজয়ীর হাসি দিতে দেখেছি কতবার, তার শেষ নেই।
প্রেম কাব্য নয়, হতাশা নয়, আমার ভাবতে মন চায় বিচ্যুত কিছু নিয়ে। ৩০ বছর বয়সে নিশ্চিন্ত হতে মন চায় না আমার, মন কাঁদে ৭৫ বছর বয়সে গিয়েও নতুন করে শুরু করে অনিশ্চয়তাকে ছুঁয়ে দেখতে। আমি এখনো হাতে গিটার থাকা ছেলেটার মধ্যে নিজেকে খুঁজে ফিরি, নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়ির গালে আজো প্রেয়সীর নরম হাতের ছোঁয়া খুঁজে বেড়াই। ডিজে পার্টির চেয়ে এই শহরের কোনো নির্জন রাস্তায় ভবঘুরে মানুষগুলোর গান শুনতে শুনতে হেঁটে যেতে আমার অসম্ভব ভালো লাগে। রাস্তার পাশে কোনো টি স্টলে চায়ের কাপের ওপর মিলিয়ে যাওয়া ধোঁয়ার মাঝে নিজের অসাড়তাগুলোকে বিলীন করে অনিশ্চিত জীবনের চোখ রাঙানি দেখতে এখনো অভ্যস্ত অগোছালো এই আমি।
এই শহরে একই সময়ে অনেক মানুষের স্বপ্ন ভাঙে। অনেক মানুষের স্বপ্ন গড়ে। কেউ অনিশ্চয়তাটুকু সঙ্গী করে পথে নামে বেঁচে থাকার জন্য কিছু পাওয়ার আশায়। আবার কেউ নিশ্চয়তা নিয়ে ঘরে ফেরে রাতে খুব আয়েশ করে ঘুমানোর জন্য। একই সময়ে কোনো ঘরের চার দেয়ালের মাঝে অভিমানের বারুদ ছোটে। বেড়ে যায় চার দেয়ালে দুজনের যোজন যোজন দূরত্ব। অন্যদিকে কারো ঘরের চৌহদ্দিতে ভালোবাসার নতুন স্বপ্ন রচিত হয়। কোনো যুবক নিজেকে দেবার মতো শেষ আশ্বাস না থাকায় অপলক চোখে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঢিল ছুড়ে দেয়—আকাশের দিকে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে। কষ্টের নিদারুণ আঘাত যখন ছেলেটাকে পিষে ফেলে, তখন তার অনুভূতি হতে খুব মন চায়।
আজো ছুঁয়ে যাই সেই কষ্টগুলোকে নিজের মাঝে—যখন কোনো প্রেমিকা তার বাউণ্ডুলে প্রেমিককে সন্ধ্যার নিয়ন আলোর রাস্তায় হাত ছেড়ে চলে যায়। ছেলেটা তখন অনিশ্চয়তায় ভোগে। প্রেমিকার ভাবটা যেন তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না! ছেলেটার অশ্রুফোঁটাগুলো নিয়ন আলোতে রঙিন হয়। আবার সেই রাস্তার অপর পাশে কোনো নতুন জুটি পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভালোবাসার নতুন স্বপ্নের বৃষ্টি নামায়। দু’পাশের রাস্তার বৃষ্টি ও অশ্রু মিলেমিশে একাকার। আমি মধ্যরাস্তায় দাঁড়িয়ে অবাক চোখে বৃষ্টি ও অশ্রুর মিশে যাওয়া দেখি।
এক ফোঁটা জল কি ছুঁয়ে গেল চোখের কোণে! কালো ঠোঁটের মাঝে ছোট ছোট প্রতিবাদের শব্দ ভিড় করে, যা বাস্তবতার গোলকধাঁধার কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে যে পাগলটা মনের সুখে গান গায়, আকুল হয়ে তাঁর কষ্টগুলোকে পড়ার ক্ষমতা আমার নেই। তবুও অনেক কষ্টের মাঝে নিজের কষ্টগুলোকে মেশাতে চেষ্টা করে যাই।
তোমার চোখের মায়ার সেই শীতল আবহ আমাকে থমকে দেয় ঝাপসা আলোর এই রাস্তায়। যে পথ ধরে তুমি চলে গেছ, সেই পথটার প্রতিটা ধুলো এখন মিশে গেছে কালের গর্ভে, কিন্তু সেই পথ আর তোমার চলে যাওয়ার স্মৃতির ক্ষত আজো আমি বয়ে নিয়ে চলি। অনেক অহংকার নিয়ে চলে যাওয়া তোমার পায়ের শব্দ আজো আমি অনুভব করি আমার সত্তায়। আমার স্বপ্নগুলোকে এলোমেলো করে তোমার সেই চলে যাওয়া আমাকে এখনো এক মুহূর্তে নির্বাক করে দেয়।
