প্রতিকূল আবহাওয়ায় চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামের ২২টি বাগানে চা উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৬ শতাংশ কম হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বিভিন্ন চা-বাগানের ব্যবস্থাপক এবং চা নিলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, এ বছর মৌসুমের শুরুতে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অধিকসংখ্যক মেঘাচ্ছন্ন দিন চট্টগ্রামের বাগানগুলোতে চা-গাছের চারার জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
চলতি বছর চা উত্পাদন শুরুর মাস মে-তে চট্টগ্রামে মাত্র এক দিন বৃষ্টি পেয়েছে চা-বাগানগুলো। কিন্তু জুন মাসে বৃষ্টি এত বেশি ছিল যে, বাগানগুলোতে চা-গাছের চারাগুলো রোদের দেখাই পায়নি। সেই সঙ্গে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত চায়ের চারার অনেক ক্ষতি করেছে। অন্যদিকে দেশের অন্যতম বৃহত্ চা উত্পাদনকারী অঞ্চল বৃহত্তর সিলেটের ১৫৩টি বাগান রোদ-বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়ায় চলতি চা উত্পাদন মৌসুমের মে মাস থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি চা উত্পাদন করতে সক্ষম হয়েছে।
চট্টগ্রামে চা উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরা জানান, অধিক সংখ্যক মেঘাচ্ছন্ন দিনসহ চলতি বছর চা উত্পাদনের মূল সময়টাতে চট্টগ্রামে ১৪৪ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বৃষ্টি এবং চা-গাছে প্রয়োজনীয় পরিমাণে রোদের তাপ না লাগার কারণে চট্টগ্রামের চা-বাগানগুলো উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২৬ শতাংশ পিছিয়ে পড়েছে। তারা জানান, গত বছর অর্থাত্ ২০২০ সালের তুলনায় চলতি বছর চট্টগ্রামের চা-বাগানগুলোতে ৩৭ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছে। গত বছর চট্টগ্রামের চা-বাগানগুলোতে বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৭৭ ইঞ্চি।
বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে প্রতিকূল আবহাওয়ায় চা উত্পাদন কম হলেও চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল মিলিয়ে দেশে চা উত্পাদনের মোট লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতি হবে না বলেই আশা করা যায়। তিনি জানান, চট্টগ্রামে গত ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি মৌসুমের ১৫টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। উত্পাদন জোগান সব ঠিক থাকা সত্ত্বেও করোনা পরিস্থিতির কারণে চা-বাগানগুলো চট্টগ্রামের চা নিলামে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পায়নি। তার মতে, যেসব ভালো মানের চায়ের জন্য ভালো বাগানগুলো প্রতি কেজি চা-পাতার মূল্য ২৩৭ টাকা থেকে ২৩৮ টাকা পাওয়ার কথা, তার পরিবর্তে তারা পেয়েছেন ২০০ টাকা থেকে ২২০ টাকা। অথচ এ চা-পাতাই চট্টগ্রামসহ দেশের নানা স্থানে খোলাবাজারে পাইকারি বিক্রেতারা প্রতি কেজি ৪০০ টাকা করে বর্তমানে বিক্রি করছেন। তিনি জানান, চট্টগ্রামে সর্বশেষ চা নিলাম অনুসারে দেখা গেছে, চট্টগ্রামসহ দেশের মোট ৮০-৮৫টি চা-বাগান ২০০ টাকা থেকে ২২০ টাকা প্রতি কেজি দরে চা-পাতা বিক্রি করতে পেরেছে। বাকি ৭০টি বাগানের চা-পাতা প্রতি কেজি ২০০ টাকার নিচে বিক্রি হয়েছে।
চট্টগ্রামে মূল্য যেমনই হোক, নিলামে চা কেনাবেচা ভালো হয়েছে বলে জানান আগ্রাবাদ ইউনিটি ব্রোকার্সের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন। তিনি জানান, চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চলসহ দেশের বাগানগুলোতে গত জুলাই পর্যন্ত চা উত্পাদন হয়েছে ৩৮ লাখ ৩০ হাজার কেজি। যা গত বছরের এ সময়ের তুলনায় ৫ লাখ কেজি বেশি। আগস্টে উত্পন্ন চা-পাতার হিসাব এখনো আসেনি। তবে ঐ মাসে উত্পন্ন চা-পাতার পরিমাণ আরো ১ লাখ কেজি হতে পারে। অবশ্য অক্টোবর থেকে চা- পাতা উত্পাদনের পরিমাণ কমে যাবে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের সর্বত্র চা উত্পাদন কমে যায়। চায়ের পাতার গুণমানও অনেক নেমে যায়। তিনি বলেন, আসন্ন তিন মাসে চা-পাতার উত্পাদন হ্রাস ও মানহীন চা-পাতার কথা বিবেচনা করে দেশের সাত-আটটি শীর্ষ স্থানীয় প্যাকেটিয়ার চট্টগ্রামের নিলাম থেকে ডাল সিজন আসার আগেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভালো মানের চা-পাতা কিনে নিচ্ছে। এসব প্যাকেটিয়াররা হলো—মেঘনা, আবুল খায়ের, ইস্পাহানী, লিভার ব্রাদার্স, এইচআরসি, ডেনিস, টি কে গ্রুপ ও মেগনোলিয়া। তারা চট্টগ্রামের নিলামে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ চা-পাতা কিনছে। বাকি ১৫০ জন প্যাকেটিয়ার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ চা-পাতা কিনছে। এই ভালো মানের চা-পাতা আগামী বছরের মৌসুম শুরু হওয়ার আগে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস নাগাদ বাজারজাত করবে তারা। এরপর নিলামে আবারও ভালো মানের চা উঠতে থাকবে। তিনি জানান, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রামে আরো তিনটি চায়ের নিলাম রয়েছে। এ সময়ে দর যেমনই হোক, ভালো বেচাকেনা হবে বলে আশা করা যায়।
