৯/১১ হামলা :কিছু প্রশ্ন আজও ব্যাখ্যাতীত

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:২১

তালেবানকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করে এবং আল-কায়েদার পতনের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা পায়নি। প্রকৃতপক্ষে, আল-কায়েদা এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো প্রতিবেশী পাকিস্তানে শত শত টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। টুইন টাওয়ার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর থেকে এই দুই দশকে এশিয়া ও আফ্রিকায় অনেকগুলো সন্ত্রাসী সংগঠন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যারা তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী নয় এমন সবাইকে নির্মূল করার বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তাধারা দ্বারা পরিচালিত

নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার প্রায় ২০ বছর ধরে আমরা কার্যত একটি ভঙ্গুর বিশ্বে বসবাস করছি। এটি একটি লজ্জাজনক অধ্যায় আর সেটির দীর্ঘস্থায়ী  যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে চলছি আমরা। দীর্ঘ এই সময়কালে আমাদের জীবনযাত্রার ধরন ও চিন্তাধারায় যেমন পরিবর্তন এসেছে, সেই সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে সন্ত্রাসী হামলায় মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ধুলোয় মিশে যাওয়া টুইন টাওয়ারকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক নানা জটিলতা মোকাবিলায়।

টেলিভিশনের পর্দায় সেই মর্মস্পর্শী ছবিগুলোর বীভত্স স্মৃতি আজও আমরা ভুলে যাইনি। যে ব্যথা সেদিন আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল বিশ্ব ভুলে যায়নি সেই কথা। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত সেদিন সারা বিশ্বের আপামর নর-নারীর মধ্যে উন্মোচিত হয়েছিল।

দুই দশক ধরে প্রতিদিন আমাদের মনে উঁকি দিয়েছে কতগুলি প্রশ্নের, যে প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই। যারা বিমান ছিনতাই করে এবং সেই বিমান হামলার মাধ্যমে টুইন টাওয়ার, পেন্টাগন ও অন্যান্য জায়গায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাদের কি উড়োজাহাজে আটকে থাকা অসহায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য কোনো মানবিক অনুভূতি ছিল না? কোন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা তাদেরকে এই কাজ করতে উত্সাহিত করেছে? প্রকৃতপক্ষে, প্রশ্নগুলি আমাদের মনে উদয় হতেই থাকে। ওসামা বিন লাদেন ও তার কট্টর অনুসারীদের মনে যে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষের বীজ ছিল সেটি কীভাবে তাদেরকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল যে, বিমান এবং টুইন টাওয়ারে থাকা সেই সমস্ত নিরীহ মানুষের জীবন তাদের কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না? রাজনৈতিক বিশ্বাস কি এভাবেই সন্ত্রাসে রূপান্তরিত হয়?

এখনো এই ধাক্কার প্রভাব সামলে উঠতে পারেনি বিশ্ব। তবুও আমাদের মনে প্রশ্নের কমতি নেই। এক দশক আগে যখন আমেরিকান বাহিনী অ্যাবোটাবাদে লাদেনের দখলকৃত সেফ হাউজে অভিযান চালিয়েছিল ও লাদেনকে জীবিত আটক করেছিল তখন কি সারা বিশ্বের সামনে সেই শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীকে বলতে দেওয়া উচিত ছিল না—কেন তিনি এসমস্ত অপকর্ম করেছিলেন? ওবামা প্রশাসন যখন বিন লাদেনকে হত্যা করেছিল এবং তার মৃতদেহ সমুদ্রে ফেলেছিল, তখন আল-কায়েদার এই শীর্ষ নেতৃত্বের মুখ থেকে  বিশ্বের অনেক প্রশ্নের উত্তর জানার প্রয়োজন ছিল।

২০০১ সালের প্রায় দুই দশক পরেও আল-কায়েদা যা করেছে সেটি কেন করেছে তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে আমরা হিমশিম খেয়ে যাই। আমরা জানি না আফগানিস্তান যখন তালেবানদের তাদের হাতের মুঠোয় ছিল, যেমনটি আজ আবার তারা দখল করে নিয়েছে, ঠিক কী কারণে তারা লাদেনকে কাবুলের আশপাশে এবং তার বাইরের পাহাড়ের একটি ঘাঁটিতে আশ্রয় দিয়েছিল।

আফগানিস্তানকে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। আরো অনেক দেশকে ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ এর হামলার পরিণতি হিসেবে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ওয়াশিংটনে তার নেতৃত্বাধীন কট্টর-রক্ষণশীলরা বিশ্বকে সংকট থেকে রক্ষা করার নামে নতুন আরো অনেক সংকটের সূচনা করেন। তারা আফগানিস্তান থেকে আল-কায়েদা উত্খাতের বিষয়ে সেই দেশের শাসকদের সঙ্গে সমঝোতা না করেই সেখানকার শাসনক্ষমতায় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।

তারা ভেবেছিল আফগানিস্তানের সমস্ত উপজাতি, গোত্র ও গোষ্ঠী তথা পুরো আফগানিস্তানকে একটি ছাদের নিচে জড়ো করতে সমর্থ হবে। তথাকথিত দেশ ও জাতি পুনর্গঠনের যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমেরিকানরা এসেছিল সেটি আদতে কাজ করেনি এবং ২০ বছর ধরে আমেরিকান, ব্রিটিশ এবং ন্যাটো বাহিনী কর্তৃক দেশটিকে যে দখল করে রাখা হলো সেটি ছিল আসলে একের পর এক পুতুল সরকার দিয়ে দেশ চালানো, যার ক্ষমতার পরিধি ছিল শুধুই কাবুলে, এর বাইরে নয়। যার ফলস্বরূপ ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের পরে ৮০,০০০ আফগান এবং ২০০০-এরও বেশি মার্কিন এবং অন্যান্য সৈন্য নিহত হয়েছে। 

তালেবানকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করে এবং আল-কায়েদার পতনের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা পায়নি। প্রকৃতপক্ষে, আল-কায়েদা এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো প্রতিবেশী পাকিস্তানে শত শত টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। টুইন টাওয়ার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর থেকে এই দুই দশকে এশিয়া ও আফ্রিকায় অনেকগুলো সন্ত্রাসী সংগঠন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যারা তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী নয় এমন সবাইকে নির্মূল করার বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তাধারা দ্বারা পরিচালিত।

আফ্রিকার আল-শাবাব এবং বোকো হারাম এখনো সক্রিয়, এর মধ্যে বোকো হারাম নাইজেরিয়ায় নিয়মিত স্কুল ছাত্রছাত্রীদের অপহরণ করে। বিধ্বংসী চিন্তাধারা এবং নৃশংসতা জন্য কুখ্যাত তথাকথিত আইএস যারা নির্দোষ অমুসলিমদের অপহরণ এবং মরুভূমিতে তাদের শিরচ্ছেদ করার পাশাপাশি টিম্বুক্টুতে লাইব্রেরি ধ্বংস করেছিল—তারা এখনো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি। বরং আইএস-কের দ্বারা কাবুল বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের নিষ্ঠুরতার প্রদর্শন তাদের সক্রিয়তাই প্রমাণ করে। পাকিস্তানে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) কে দমন করার জন্য সেই দেশের সামরিক সংস্থাগুলো অক্ষম কিংবা অনিচ্ছুক।

২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে দুই দশকে পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল নীতি গ্রহণের ফলে তিনটি দেশ ধ্বংস হয়েছে। আল-কায়েদার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং টনি ব্লেয়ারের মতো ক্ষমতাবান মানুষদের পৃথিবীকে একটি নিরাপদ গ্রহ হিসাবে পুনর্নির্মাণ করার বিভ্রান্তিকে উসকে দিয়েছিল। 

তারা শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলেছিল। তাদের নির্লজ্জ সমস্ত দায়মুক্তি এবং ক্ষমতার অহংকারে তারা ইরাক মতো একটি সার্বভৌম ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে হামলা চালায় এবং মিথ্যাচারের ভিত্তিতে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি এবং দখলের অভিযোগ আনে। এভাবে বিশৃঙ্খলার দুয়ার উন্মোচিত করার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবাষ্প তারাই বপন করেছিল।

এইসব মানুষদের তাদের যুদ্ধাপরাধের জন্য কখনো বিচার করা হয়নি। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের ক্ষেত্র প্রস্তুতে ন্যাটো শক্তিকে তাদের ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়নি এবং এর মাধ্যমে যে বীজ বপন করা হয়েছিল সেটি দুর্নিবার অস্থিতিশীলতার ভয়ংকর জঙ্গলে অঙ্কুরিত হয়েছে।

আমাদের ভঙ্গুর এই বিশ্বে বৈশ্বিক রাজনীতি আজ আফ্রিকা থেকে ইউরোপের উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টারত হাজার হাজার শরণার্থীর একটি আয়না চিত্র যেই রাজনীতির জাঁতাকলে তাদের বড় একটি একটি অংশের সলিলসমাধি হচ্ছে। ইসলামের মুখোশধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বাংলাদেশে ব্লগার, লেখক এবং প্রকাশকদের হত্যা করেছে। আল-কায়েদার বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থানের পেছনে তাদের প্রত্যক্ষ মদদ এবং এর সঙ্গে পশ্চিমা ভ্রান্তনীতির সম্মিলন রাজনীতি, চিন্তাভাবনা থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গাতেই মৌলবাদিতা প্রবেশের সুযোগকে উসকে দিয়েছে।

এই দুই দশকে, গণতন্ত্রের ধারণা ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর দূরত্বে চলে গিয়েছে। সামরিক জেনারেলরা থাইল্যান্ড, মায়ানমার এবং মিশরের বৈধ সরকারকে উত্খাত করেছে এবং এই ধরনের নৃশংস আচরণে কেউ উদ্বিগ্নও নয়! রাশিয়া নিজ দেশ শাসনে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ইরাকের পর কাবুলে তালেবানদের পুনরায় ক্ষমতা দখল আমেরিকার খ্যাতিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ব্রিটেন বৈশ্বিক রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে নিজের অবস্থান খুঁজে পেতে সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

ফ্রান্সে ইমানুয়েল ম্যাক্রন অতি-ডানপন্থি মেরিন লে পেনের সঙ্গে দ্বিতীয় নির্বাচনি লড়াইয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতির জ্ঞান-বিজ্ঞানের দুর্বলতা এই মহামারির সময়ে তার দেশকে গভীর সামাজিক সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।  ইরানকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য ন্যক্কারজনক প্রচেষ্টা চলছে।

জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড বিশ্ব ভুলে গেছে এবং মুহাম্মদ বিন সালমান আইনের  ঊর্ধ্বেই রয়ে গেছেন। মিয়ানমারের জান্তা গায়ের জোরে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে, নিকট ভবিষ্যতে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো আশা নেই। 

সেপ্টেম্বর ২০০১-পরবর্তী ২০ বছরে আমরা এমন একটি অস্থিতিশীল ও ভঙ্গুর পৃথিবীতে বসবাস করছি। আমাদের স্বপ্নের প্রদীপ প্রবল ঝোড়ো বাতাসের বিরুদ্ধে জ্বলতে থাকার সংগ্রামে লড়াই করে চলেছে প্রতিনিয়ত। দুই দশক আগে, আমাদের পৃথিবীর বদলে যাওয়ার যে স্ফুলিঙ্গের আভাস মিলেছিল, সেই আগুন এখনো জ্বলছে।

n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক

ইংরেজি থেকে অনুবাদ :এইচ এম নাজমুল আলম