দূরদর্শী স্বাস্থ্য খাত অনেক খাতের অপচয় কমাবে তৃপ্তি বালা

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:২৪

বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বর্তমানে ৭৩ বছর। করোনাকালে যা দেখছি, তাতে অনেক সময়ই এই গড় আয়ুর অনেক আগেই অনেককে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ যেমন মারণ-ভাইরাস, তার সঙ্গে সঙ্গে ‘হোস্ট ফ্যাক্টর’ও কম দায়ী নয়। তাবত্ প্রাণিজগতের টিকে থাকার সূত্রই হলো ‘সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট!’ মানবকুলে যা নির্ণীত হতে পারে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুষম শরীর-স্বাস্থ্যের ওপর। সুষম শরীর-স্বাস্থ্যের মূল কথাই হলো, সঠিক খাদ্য ও পুষ্টি। সুস্থ শরীর এবং মন বিকাশে এর বিকল্প নেই। আর এই শরীর-মন বিকাশের মধ্য দিয়েই তো বিকশিত হতে পারে আমাদের অন্তর্গত রোগপ্রতিরোধ-ব্যবস্থা।

একটি দেশের জনস্বাস্থ্যকাঠামো এবং সে-সংক্রান্ত শিক্ষা-চেতনার ওপরই নির্ভর করে জনসংখ্যার পরিমিতি। সুস্থ-সবল জনগোষ্ঠী দেশ ও জাতির প্রধান চালিকাশক্তি। অন্যদিকে দুর্বল অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশ-জাতির ওপর বোঝাস্বরূপ। এসব তত্ত্ব আমাদের জানা। দরকার এই তত্ত্বকথাকে বাস্তবে রূপ দিতে সচেতন মানুষকে নিজ নিজ দায়িত্ব ঠিকঠিক পালন করা। জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবাকে এগিয়ে নিতে সরকারি, বেসরকারি, জাতীয়-আন্তর্জাতিক সহায়ক সংস্থার নানাবিধ কর্মসূচি আছে। এসবের যথাযথ পরিকল্পনার সঙ্গে তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পূর্ণ হলো। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বছরটিকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রয়োজন—খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থানের মতো বিষয়গুলো পূরণ হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময়ই মনে হয়, এসব মৌলিক চাহিদা পূরণে আমরা আজও পিছিয়ে! যে দরদ এবং আন্তরিকতা দিয়ে বিষয়গুলো পূরণ হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। এক্ষেত্রে বরাদ্দের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে নানাসব অনৈতিক এবং অদূরদর্শী ক্রিয়াকলাপে।

ট্রেনিং ওয়ার্কশপ সেমিনারের ক্ষেত্রে মনে হয়, অনেক সময়ই কাজের চেয়ে এসবে অংশ নেওয়াই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। খাদ্য ও পুষ্টি—তথা স্বাস্থ্যের এই মৌলিক বিষয়ে জ্ঞান স্বাস্থ্যসেবাকর্মী বা কর্তাব্যক্তি সবারই কমবেশি থাকার কথা। সাধারণ বিজ্ঞানে সুষম খাবারের অধ্যায়টি মাধ্যমিক পর্যায়েই আমরা আত্মস্থ করে ফেলি। শিক্ষাজীবনের বাকি সময়গুলোতে তার উত্কর্ষ-বিকাশ তো এমনিতেই হয়ে যায়। মানে এই নয় যে, বিষয়ে ট্রেনিংয়ের আমাদের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন আছে অবশ্যই। তবে, আমাদের প্রায়োরিটি ঠিক করা প্রয়োজন। জনগোষ্ঠীর মৌলিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে দরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জরুরি কার্যক্রম গ্রহণ। ট্রেনিং চলবে পাশাপাশি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবেও। এখানে বলতে চাই, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের একটি বড় অংশ যদি মায়ের গর্ভকালীন খাদ্য সুরক্ষা থেকে শুরু করে স্কুলে ‘মিডডে মিল’-এ পুষ্টিকর খাবার (দুধ ডিম কলা রুটি) দিয়ে চালিয়ে যাওয়া যেত, তাহলে পাঁচ বছর পর হলেও আমরা তার সুফল পেতাম। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গর্ভবতী মায়ের এএনসি, পিএনসি ভিজিটের সময় অপুষ্ট মায়েদের ভর্তি রেখে এই খাদ্য সহায়তার অধীনে আনতে পারা যায়। তাছাড়া ‘মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র’ এবং ‘এফডব্লিউসি’গুলোতে (যেখানে ডেলিভারি সুবিধা আছে) ভর্তি মায়েদের মিলের (তিন বেলা খাবার) ব্যবস্থা থাকলে তারা প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির ব্যাপারেও আগ্রহী হবেন। এসব কর্মসূচি অবশ্যই ১ম এবং ২য় সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাতে করে প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি নিশ্চিতের পাশাপাশি মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু যেমন কমে আসবে, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনাও সঠিক নিয়মে এগিয়ে যাবে।

আমরা স্বাস্থ্যকর্মীগণ যদি সিটে থাকি, মায়েদের প্রতি আন্তরিক হই, তাহলেই তারা আমাদের ওপর আস্থা পাবেন এবং সেবা নিতে আসবেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনা মূল্যে কী কী সেবা দেওয়া হয়—সেসব তথ্য জানাতে হবে, শুধু সিটিজেন চার্টার দেখিয়ে দিলেই হয় না। এক্ষেত্রে মায়ের স্বামীকেও সম্পৃক্ত করা দরকার। তাকে বোঝানো দরকার, তিনি যেন প্রতিটি ভিজিটে মায়ের সঙ্গে থাকেন, তার সহমর্মী হন। যতদিন না আমাদের শতভাগ মা শিক্ষিত হচ্ছেন, আমাদের দায়িত্ব অনেক।

‘টেকসই উন্নয়ন’—বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। ২০৩০ সাল নাগাদ মাতৃমৃত্যু ৭০ এর নিচে এবং শিশুমৃত্যু বারোর নিচে (টেকসই উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা) নামিয়ে আনতে না পারলে আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব না। বাল্য বা কৈশোর বিবাহ রোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি নিশ্চিত করে অতি অনায়াসেই আমরা তা অর্জন করতে পারি। ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি।

আমার তো মনে হয়, স্বাস্থ্য খাতে যদি আমরা সর্বোচ্চ মনোযোগ দিই, তাহলে অন্যান্য অনেক খাতের অনেক অপচয় রোধ করতে পারি। আমাদের সন্তানেরা যদি সুস্থ থাকে (মাতৃগর্ভকাল থেকেই যার শুরু), মায়ের দুধ পান করে—সে ঘনঘন অসুস্থ হবে না, সময়মতো স্কুলে যেতে পারবে; কৈশোর-যৌবন প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। এবং একসময় এরাই আমাদের দেশের হাল ধরবে।

‘মানুষ হতে হবে’—জাতির জনক বলেছেন, ‘পড়াশোনা করে মানুষ হতে হবে।’ আমরা যেন সেই মানুষটি হয়ে উঠি। দেশ এবং জাতির সন্তান হিসেবে কর্তব্যকাজগুলো ঠিক ঠিক করতে পারলে তবেই শিক্ষার মানে হবে। সমৃদ্ধ একটি দেশ—জাতির জনকের বড় স্বপ্ন ছিল যে!

n লেখক :চিকিত্সক, ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ