আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার ভোজ্য তেল সয়াবিন ও পামসুপারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও তা মানছেন না ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে ভোজ্য তেল বিক্রি হচ্ছে। তাহলে দাম নির্ধারণ করে কী লাভ হলো? এই প্রশ্ন ভোক্তাদের।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শান্তিনগর, তুরাগ এলাকার নতুন বাজার ও কাওরানবাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত দরে কোথাও পামসুপার ও খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে না। অথচ গত রবিবার প্রতি লিটার সুপার পাম অয়েলের খুচরা মূল্য সর্বোচ্চ ১১৬ টাকা ও খোলা সয়াবিন তেলের মূল্য ১২৯ টাকা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। কিন্তু গতকাল বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রতি লিটার পামসুপার ১২০ থেকে ১৩০ টাকা ও খোলা সয়াবিন ১২৬ থেকে ১৩৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) তাদের গতকালের খুচরা বাজারদর প্রতিবেদনেও বাড়তি দরে খোলা সয়াবিন ও পামসুপার বিক্রির তথ্য তুলে ধরেছে। তবে বোতলজাত সয়াবিন নির্ধারিত দরের মধ্যেই বিক্রি হতে দেখা গেছে। খুচরাবাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা ও ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন ৬৬০ থেকে ৭১০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
গতকাল কাওরানবাজারে ক্রেতা নাজমুল আলম বলেন, সরকার পামসুপার ও সয়াবিনের দাম নির্ধারণ করে দিল। কিন্তু ভোক্তাদের তো কোনো লাভ হলো না। নির্ধারিত দরে পামসুপার, খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রেতারা নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি চাচ্ছে।
এক বছর ধরেই ভোজ্য তেলের দাম লাগামহীন
ভোজ্য তেল সয়াবিন ও পামঅয়েলের দর ওঠানামার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত এক বছর ধরেই নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম লাগামহীন। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এই সময়ে খুচরা বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের দাম ছিল ৪৬০ থেকে ৫১০ টাকার মধ্যে। এক লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৮৪ থেকে ৮৬ টাকায়। আর প্রতি লিটার পামসুপার অয়েলের দাম ছিল ৭৩ থেকে ৭৬ টাকা। সরকারের সংস্থাটির হিসেবেই গত এক বছরে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে ৩৮ দশমিক ১০ শতাংশ, পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিনে ৪০ দশমিক ২১ শতাংশ, এক লিটারের খোলা সয়াবিন তেলে ৫১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ও পামসুপার অয়েলে ৬৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ দাম বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও পামঅয়েলের দাম বাড়ায় দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। তারা জানান, গত বছর এপ্রিল থেকে জুন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৭০০ ডলারের আশেপাশে। আর এ বছর এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ ডলারে। আর বর্তমানে প্রতি টন সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩৭০ ডলারে। যদিও এক মাস আগে তা ১ হাজার ৪৪০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আর প্রতি টন পামঅয়েল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১৮০ ডলারে। পামঅয়েলের দামও এক মাস আগে ১ হাজার ২৩০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও পামঅয়েলের দাম বাড়তি কেন?
বিশ্লেষকদের হিসেবে, করোনার মধ্যেও বিশ্বে সয়াবিন, পামঅয়েলের উত্পাদন বেড়েছে। কিন্তু ডলারের বিপরীতে উত্পাদক দেশগুলোর মুদ্রা শক্তিশালী হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে। এছাড়া উত্পাদক দেশগুলো রপ্তানি শুল্ক বাড়িয়েছে। তবে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হলো, এই তেলের উপজাত পণ্য সয়ামিলের চাহিদা কমে গেছে। ফলে দাম বেড়েছে সয়াবিন তেলের।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর সবচেয়ে বড় ভোজ্য তেলের বাজার মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী মো. আলী ভুট্টো ইত্তেফাককে বলেন, বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের বাজার গত এক বছর ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। তাই দেশের বাজারও অস্থির। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ সয়াবিন তেল ৪ হাজার ৯৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সপ্তাহের ব্যবধানে ২০০ টাকা বেশি। এছাড়া পামঅয়েল ৪ হাজার ৫৬০ টাকা ও পামসুপার ৪ হাজার ৬৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫০ টাকা বেশি।
সরকার সয়াবিন ও পামসুপারের দর নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও বাড়তি দরে খুচরা বাজারে বিক্রি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে পাইকারি বাজারের কোনো হাত নেই। খুচরা বাজারে কঠোর মনিটরিং দরকার। তা না হলে ভোক্তাদের ভোগান্তি কমবে না।
কমেছে চালের দাম
এদিকে সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর খুচরাবাজারে সরু চালের দাম কমেছে। কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা কমে বর্তমানে বাজারে নাজিরশাইল/মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬৬ টাকার মধ্যে। তবে অন্যান্য চালের দাম কমেনি। মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা ও মাঝারি মানের চাল পাইজাম/লতা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকার মধ্যে। এছাড়া ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে। প্রতি হালিতে ১ টাকা বেড়ে ফার্মের লাল ডিমের হালি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৮ টাকায়। আর ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
