গত বছরের মার্চ থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে নানা শর্ত আরোপ করে আজ ১২ সেপ্টেম্বর থেকে চালু হতে যাচ্ছে দেশের স্কুল-কলেজগুলো। সম্প্রতি ইউনেসকো এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। সুদীর্ঘ ৬১ সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব থাকা সত্ত্বেও বহু আগে থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে চালু রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ থাকলেও কিছুদিনের মধ্যে পুনরায় চালু হয় ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠদান কর্মসূচি। এ ক্ষেত্রে ক্লাসরুম, ব্ল্যাকবোর্ড, হোয়াইটবোর্ড, চক, মার্কার, ঘণ্টার শব্দের বদলে জায়গা করে নেয় মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট, জুম, গুগুল ক্লাসরুম, লগইন, লগআউট ইত্যাদি শব্দ। অনলাইন প্ল্যাটফরমগুলোর পাশাপাশি সরকারি টেলিভিশনেও চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে করোনাকালেও মোটামুটি চলমান রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার সুবিধাভোগী কারা, কী পরিমাণ শিক্ষার্থী এই সুবিধার আওতায় রয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে রয়েছে মতভেদ ও বৈষম্য। শহুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তেমন ঝামেলা ছাড়া অনলাইনে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করতে পারলেও গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুব সহজে তা করতে পারেনি। অন্যদিকে, শহরের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিজ্ঞান এবং আর্থিক অবস্থা ভালো থাকায় তারা কোনো ঝামেলা ছাড়াই করছে অনলাইন ক্লাস, কিন্তু গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। ডিজিটাল মাধ্যমে ক্লাস করতে যেসব ডিভাইসের প্রয়োজন হয়, একজন দরিদ্র পিতামাতার পক্ষে তার জোগান দেওয়া সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি। তার ওপর রয়েছে ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, যা বহন করা অনেকটাই কষ্টসাধ্য। কিছু কিছু গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পাঠদান সম্পন্ন করলেও সব শিক্ষার্থী তাতে অংশ নিতে পারেনি।
বেসরকারি এক পরিসংখ্যান বলছে, প্রয়োজনীয় ডিভাইস বা প্ল্যাটফরমের অভাব প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর। ফলে করোনা মহামারির কারণে বহু শিক্ষার্থী পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউড অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স সংস্থা দুটির যৌথ এক গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ১৯ ও ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে গেছে। কিন্তু মহামারির আগে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ছিল অনেক কম। শুধু তাই নয়, সংস্থা দুটির পরিচালিত ‘কোভিড ইমপ্যাক্ট অন এডুকেশন লাইফ অব চিলড্রেন’ শিরোনামে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত তিন ধাপে দেশ জুড়ে পরিচালিত এক গবেষায় দেখা গেছে, মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১০ শতাংশ অনলাইন প্ল্যাটফরমের সুবিধা নিতে পারছে। ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়ালেখায় না ফেরার শঙ্কা রয়েছে এবং ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক চাপে রয়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপে উঠে এসেছে, করোনাকালে দেশে বাল্যবিবাহ বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
এমনিতেই শহর ও গ্রামীণ সামজের শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে বিশাল পার্থক্য, তার ওপর করোনা আরো প্রকট করল এই পার্থক্য। পুনরায় চালু হওয়ার পর এই বৈষম্য কতটা দূর হবে তা এখন ভাবার বিষয়। তাই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি কাজ করতে হবে বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও ও প্রতিষ্ঠানকে। যে শিশু পরিবারের হাল ধরতে বই-খাতা ফেলে কাজে নেমেছে, তার পরিবারের উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। উপবৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে, পিতামাতাকে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে করোনা মহামারির পর আর কেউ বাল্যবিবাহের শিকার না হয়।
n লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
