বিয়ের পর ইরাকে নিয়ে বিক্রি করে দিতেন তিনি

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৩৩

বিশেষ প্রতিনিধি

লিটন মিয়া। এইচএসসি পাশ করে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চাকরি নেন। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সেখান থেকে চাকরিচ্যুত হন। পরবর্তীকালে চলে যান ইরাকে। দেশটির রাজধানীর একটি হাসপাতালে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করেন—এমন পরিচয় দিয়ে দেশে গিয়ে বিয়ে করতেন। এভাবে ছয় জনকে বিয়ে করে পাঁচ জনকে ইরাকে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজের বউ ছাড়াও অন্তত ৪০ জন নারীকে          মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব শনিবার সকালে রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরে অভিযান চালিয়ে লিটন মিয়া ও তার সহযোগী আজাদকে গ্রেফতার করে।

র্যাবের ভাষ্যমতে, লিটন মিয়া নারী পাচারকারী সিন্ডিকেটের মূলহোতা। তারা দুজন (লিটন ও আজাদ) সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্রের সদস্য। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি বিলাসবহুল প্রাইভেটকার কার, বিয়ার, দেশি-বিদেশি জাল টাকা, পাসপোর্ট ও বিভিন্ন সিল। গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এলিট ফোর্স র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আটকদের টার্গেটে থাকত বিউটি পার্লারে কাজ জানা ও নার্সিং পেশায় নিয়োজিত নারীরা। বিদেশে সুপারশপে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তারা নারীদের পাচার করতেন। তাদের ইরাক, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে জিম্মি করে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতেন। এসব দেশে তাদের একাধিক সেফহাউজ রয়েছে।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, নারীদের মধ্যপ্রচ্যে নিয়ে যাওয়ার পর সুযোগ বুঝে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হতো। মানব পাচার চক্রের ১৮ জন সদস্যের মধ্যে সাত জন ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যে আর বাকিরা দেশে এই কাজ করছিলেন। তিন থেকে চার লাখ টাকার বিনিময়ে নারীদের চাকরির আশ্বাসে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যাওয়া হতো। মানব পাচারের প্রথম ধাপে ট্যুরিস্ট ভিসায় দুবাই, এরপর ভিজিট ভিসার মাধ্যমে ইরাকে নেওয়া হতো। চক্রটি ৩০-৪০ জন নারীকে পাচার করেছে।

কে এই লিটন মিয়া?

র্যাব বলছে, ১৯৯২ সালে ঢাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি পাশ করেন লিটন মিয়া। এরপর সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে মেডিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে চাকরি শুরু করেন। মিথ্যা প্ররোচনা ও অনৈতিক কাজের জন্য সেখান থেকে তার চাকরি চলে যায়। এরপর লিটন ইরাকে যান। এসময় নিজেকে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের একটি স্বনামখ্যাত হাসপাতালে চাকরি করতেন বলে পরিচয় দিতেন। পরবর্তীকালে কয়েক জন মিলে ইরাকে নারী পাচার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

লিটন নারীদের প্রথমে ইরাকে মেডিক্যাল চাকরির প্রলোভন দেখাতেন। এভাবে সখ্য গড়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ-ছয় জনকে বিয়ে করেন। অনেককে টেলিফোনে কিংবা সরাসরিও দেশে এসে বিয়ে করেছেন। এরমধ্যে লিটন ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ইটালিতে ছিলেন। এই সময়েই তিনি বিয়েগুলো করেছেন। এসব বিয়ে লিটন পাচারের উদ্দেশে করেছেন বলে দাবি র্যাবের।

র্যাব জানায়, সবশেষ পাচার হওয়া এক নারী র্যাবকে জানিয়েছেন, তিনি ইরাকে সেফহাউজে থাকাকালে সেখানে ১৫-২০ জনকে দেখেছেন। সেফহাউজ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এই নারী ইরাকের একটি হাসপাতালে চাকরি করতেন। পরবর্তীকালে সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন। লিটন মিয়া ২০১৯ সালের পর আর ইরাকে যেতে পারেননি। পরে দেশেই বালি ব্যবসাসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন।

আজাদের ভূমিকা

র্যাবের হাতে গ্রেফতার আজাদ দেশেই সিন্ডিকেটটির প্রতারণার বিষয়টি দেখতেন। দেশে তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই নারীদের পাচার করা হয়েছে। তিনি পাসপোর্ট প্রস্তুত, টাকা নেওয়া, টিকিট কেটে দেওয়া—এসব বিষয় দেখতেন।