নির্বিঘ্নে উল্লুক চলাচলে সড়কের ওপর দিয়ে দড়ির সংযোগ

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৩০

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা

১২৫০ হেক্টর আয়তনের জীববৈচিত্র্যে ভরপুর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য বিখ্যাত এ বনের ভেতর দিয়ে রয়েছে রেল ও সড়ক পথ। ঝুঁকিপূর্ণ এ দুটি পথে ফিবছর যানবাহন ও ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাচ্ছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকসহ বন্যপ্রাণীর চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সম্প্রতি পাঁচটি স্থানে দড়ি টানানো হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল যৌথভাবে দড়ি টানানোর  কাজ করে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে অনন্য মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া উদ্যানের পুরোনো নাম পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বৃক্ষরোপণ করলে সেটি বনে পরিণত হয়। ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ, সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উঁচু নিচু টিলা জুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যানে দেখা মিলে বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণীর। উদ্যান ঘোষণার সময় সার্ভে অনুযায়ী ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর কথা বলা হয়। এরমধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, চার প্রজাতির উভয়চর, ছয় প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বনটি বিখ্যাত। তবে বনের ভেতর দিয়ে রেল ও সড়কপথ এবং শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জে প্রধান বৈদ্যুতিক লাইনে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল।

এই অবস্থা বিবেচনায় লাউয়াছড়া বনের ভেতর উল্লুকসহ অন্যান্য প্রাণীর চলাচল নির্বিঘ্ন করতে পাঁচটি স্থানে দড়ি টানানো হয়েছে। উদ্যানকে দ্বিখণ্ডিত করে চলে যাওয়া সড়ক ও রেলপথের দুই পাশের গাছের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে এই দড়িটানা। সড়কের দুই পাশের উঁচু দুটি গাছের ডালপালার সঙ্গে নাইলনের মোটা রশি টানানো হয়েছে। এগুলোর দূরত্ব ২২ থেকে ২৫ মিটার।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুন নাহারের নেতৃত্বে ছয় জনের গবেষক দল এই কাজ করেন। তাদের সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে ছিলেন আরো তিন জন। এই গবেষক দলে কাজ করেন সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাবির বিন মোজাফফর, ইসাবেলা ফাউন্ডেশনের বন্যপ্রাণী গবেষক সাবিত হাসান, গবেষক হাসান আল-রাজী, নেকমের ফিল্ড ম্যানেজার গবেষক তানভির আহমেদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র সজিব বিশ্বাস ও তানিয়া আক্তার। বন অধিদপ্তরের অর্থায়নে তারা বনের ভেতরের রেললাইনের ওপর চারটি এবং সড়ক পথে একটি দড়ির সংযোগ স্থাপন করেন। এগুলো মূলত ১০ সেন্টিমিটার ব্যাসের দড়ি। এই দড়ির সংযোগ কতটুকুু কাজে লাগবে তা জানতে বসানো হয়েছে ক্যামেরাও।

বন্যপ্রাণীর চলাচলের সুবিধার্থে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্যানোপি ব্রিজ রয়েছে। তবে এমন দড়ি ধরে চলাচলে অভ্যস্ত হতে বন্যপ্রাণীর কয়েক মাস সময় লাগে বলে গবেষক দলের সদস্যদের ধারণা।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর সড়ক ও রেলপথের বিভিন্ন স্থান অনেক প্রশস্ত। এতে অনেক প্রাণী এক পাশের গাছ থেকে অন্য পাশের গাছে লাফ দিয়ে যেতে পারে না। কিছু প্রাণী নিচে নেমে সড়ক ও রেলপথ পাড়ি দেয়। এভাবে পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক প্রাণী মারা যায়। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সড়কে চিত্রা হরিণ, বানর, মেছো বিড়াল, মুখপোড়া হনুমান, চিতা বিড়াল, সাপ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যু হয়। করোনার কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় এই সময়ে রেললাইনে বন্যপ্রাণী কাটা পড়ার ঘটনা নেই। সড়কপথেও যান চলাচল কম ছিল। তিনি আরো বলেন, ‘দড়ির সংযোগগুলো লাউয়াছড়া বনের বানর জাতীয় প্রাণী, বিশেষ করে উল্লুুকের জন্য খুবই উপকারী হবে বলে আমরা আশা করছি। এক মাস পরপর ক্যামেরা দেখে বন্যপ্রাণীর চলাচলের বিষয়ে পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যাবে।’