সুপ্রাচীনকাল থেকে আজকের যে আধুনিক সভ্যতার উত্থান, তাতে রয়েছে নারী ও পুরুষের সমান অবদান। নারী-পুরুষের সমানুপাতিক কর্মপ্রচেষ্টায় সূচিত হয়েছে বর্তমান অত্যাধুনিক সভ্যতা। সময়ের সোনালি প্রবাহে নারীদেরকে কর্ম ও যোগ্যতার মানদণ্ডে ছোট করে দেখার প্রবণতা এখন অনেকটাই পালটে গিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে নারীরা অনলাইন বিজনেস বা ই-কমার্সে হয়ে উঠছেন একেকজন আইকন; যা একইসঙ্গে নারীর ক্ষমতায়ন ও দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধকরণে রাখছে অভূতপূর্ব ভূমিকা।
ই-কমার্সের মাধ্যমে দেশের শিক্ষিত সচেতন নারীরা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই নয়, বরং সমাজের অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কর্মসংস্থান তৈরিতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছেন। হাতে তৈরি সুনিপুণ কারুকার্য শোভিত পোশাক, জড়োয়া গহনা, মুখরোচক খাদ্য, শিশুখাদ্য, গৃহসজ্জা, প্রসাধনী সামগ্রী ইত্যাদিসহ এমন কিছু নেই যা নারীদের মাধ্যমে বর্তমানে অনলাইনে বেচাকেনা হচ্ছে না। অনেকেই আবার নিজের বিশেষ দক্ষতাকে পুঁজি করে পরিচালনা করছেন ব্যবসা! কেউ গান শেখানোর টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে আয় করছেন, কেউবা আবার নৃত্য, গিটার শেখানো, আর্ট, আবৃত্তি, কেয়ার গিভিং, স্বাস্থ্যসেবাসহ আরো নানাবিধ বিষয়কে ব্যবসায়ের মতো ইতিবাচক বিষয়ে রূপদান করেছেন। এতে দুদিক থেকেই লাভবান হচ্ছেন তারা। ফলাফল হিসেবে এই ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ বেড়ে চলেছে সমানুপাতে। ই-কমার্স আবির্ভূত হয়েছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম একটি প্ল্যাটফরম হিসেবে।
কর্মজীবী ও উদ্যোক্তা নারীদের নিয়ে প্রকাশিত ভেনচার ক্যাপিটাল রিসার্চ ডেটাবেজ পিচবুক-এর ২০১৯ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী শতকরা মাত্র ২ শতাংশ নারী ব্যাবসায়িক কাজে মূলধন বিনিয়োগের ক্ষমতা রাখেন। যেখানে পুরো পৃথিবী দিচ্ছে প্রতি ১০০ জনে মাত্র দুজন নারীকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পরিসংখ্যান, সেখানে উন্নয়নশীল এ দেশের বর্তমান স্থির চিত্রে অনেকটাই আশার আলো জাজ্বল্যমান! কারণ, স্বল্প পুঁজিতে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা দেশের মোট উদ্যোক্তাদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী; গৃহিণী কিংবা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী। অনলাইন ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত এসব নারীর ভাষ্যমতে, ঘরের বাইরে গিয়ে ৮-১০ কর্মঘণ্টা সময় ব্যয় করে কাজ করার চাইতে গৃহস্থালির কাজ সেরেও বাসায় বসেই ব্যবসা করা যাচ্ছে। এতে সময় ও শ্রম দুটোই দেওয়া যাচ্ছে অধিক পরিমাণে।
স্বল্প মূলধনের এ ব্যবসাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে আত্মপ্রত্যয়ী এসব নারী উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানের বিকল্প নেই। যদিও সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে নারী এসএমই উদ্যোক্তাদের বাজার সম্ভাবনা ও অর্থায়ন বৃদ্ধি’ শীর্ষক সমীক্ষা মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের বার্ষিক ঋণ চাহিদার ৬০ শতাংশই পূরণ করতে অপারগ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ পাওয়া সহজ করতে কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। এর ফলপ্রসূ বাস্তবায়ন হলে নারীরা তাদের এই ক্ষুদ্র ব্যবসাকে বৃহত্ পরিসরে রূপদানের সফল রূপকার হবেন; হবেন দেশের মেরুদণ্ড তথা জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধকরণের গর্বিত অংশীদার।
বর্তমান করোনাকালেও নারীরা নিজেদের উপার্জনের এ পথ সুগম রেখেছেন। সচেতন পুরুষরা নিজেদের কাজের পাশাপাশি স্ত্রী, কন্যা কিংবা বোনকে অনলাইন ব্যবসায় করছেন সহযোগিতা। ফলে স্বাবলম্বনের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে সম্ভাবনাময় সুপ্রশস্ত সফলতার সোপান। ই-কমার্সের মাধ্যমে নারীরা হয়ে উঠছেন একেকজন সফল উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। তাই এই যুগোপযোগী উদ্যোগে সরকারি ও বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
