মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ জরুরি

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৩৬

দীর্ঘদিন ধরে সমাজে চলমান সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ধর্ম, দর্শন, লালিত আচরণ ও বিশ্বাস এবং স্থানীয় রেওয়াজের আলোকে মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। মূল্যবোধ মানুষের আচার-ব্যবহার ও রীতিনীতির নিয়ন্ত্রক। এর মাধ্যমে প্রত্যাহিক ভালো-মন্দ কাজের তফাত নির্ণয় করা হয়। প্রতিটি সমাজে একটি নিজস্ব মূল্যবোধ রয়েছে যার ওপর ভিত্তি করে সমাজটি এগিয়ে যায়। এজন্যই যে সমাজের মূল্যবোধ যত বেশি সুসংগঠিত সে সমাজ তত বেশি উন্নত ও প্রগতিশীল। আর যে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে সেখানে অনিয়ম, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা বাসা বাঁধে; সামাজিক সংহতি বিনষ্ট নয়। এতে করে জনজীবন একটু একটু করে পতনের দিকে পর্যবসিত হয়। তাই মানব সভ্যতাকে ঠিক রাখতে ও সামাজিক সংহতি, সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে মূল্যবোধের পরিপূর্ণ বিকাশের বিকল্প নেই।

সমাজবিজ্ঞানী অ্যাডওয়ার্ড স্প্রেঞ্জার মানুষের আচরণকে যথাযথ বিশ্লেষণ করে ছয় ধরনের মূল্যবোধের কথা বিবৃত করেছেন। এগুলো হলো—তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক, সৌন্দর্যবোধ, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। মূল্যবোধগুলো বয়স ও সময়ের প্রেক্ষিতে নিয়ত পরিবর্তনশীল। ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও পরিবেশভেদে এসবের মাত্রারও তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। যে সমাজে মানুষের মধ্যে তাত্ত্বিক মূল্যবোধ বেশি সেই সমাজ খুব বেশি সৃষ্টিশীল ও প্রগতিশীল হয়। আবার যে সমাজে অর্থনৈতিক মূল্যবোধের পরিব্যক্তি রয়েছে সে সমাজের বুনিয়াদ খুব মজবুত হয়, ধনসম্পদের অপচয় ঘটে না। এমনি করে সৌন্দর্যবোধ মূল্যবোধের প্রাধান্য থাকলে সামাজিক শিল্পচর্চার ধারা বিকশিত হয়, সামাজিক মূল্যবোধ মানবপ্রেম বাড়ায়, এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ যথাক্রমে শক্তিশালী সমাজ ব্যবস্থা ও আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ ঘটায়। একটি সমাজে একাধিক মূল্যবোধের প্রকাশও থাকতে পারে। তবে কখনো এসব মূল্যবোধে বিমুখতা এলে সামাজিক সম্পর্কের জাল দুর্বল হয়ে যায়।

বর্তমানে আমাদের তরুণ সমাজের একাংশে যৌন হয়রানি, গুরুজনদের প্রতি অবজ্ঞা, অসহায়দের সাহায্য না করা, মাদকাসক্ততা, আত্মকেন্দ্রিকতা, আইনের অবমাননার মতো মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় লক্ষ করা যাচ্ছে।  এর পেছনে বেকারত্ব, পারিবারিক অনুশাসনের অভাব, প্রযুক্তির অপব্যবহার, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, সঙ্গদোষ, সুশাসনের অভাবসহ অসংখ্য কারণ জড়িয়ে আছে। ফলে সামাজিক অনিরাপত্তা, অসন্তোষ, বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাচ্ছে। অথচ প্রগতিশীল এই সমাজে মূল্যবোধের এমন অবক্ষয় কোনোভাবেই কাম্য নয়। যতদ্রুত সম্ভব এর থেকে পরিত্রাণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে মূল্যবোধ গঠনের মাধ্যমগুলো পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমবয়সীর দল, সম্প্রদায়, সমাজ ও কৃষ্টিকে আরো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। ছোট্ট শিশু যেন উপযুক্ত সামাজিকতার আদলে গড়ে উঠতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে প্রযুক্তির অপপ্রভাবের ফলে নিজস্ব সমাজ-সংস্কৃতির মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এর থেকে উত্তোরণের পথ খুঁজে নিতে হবে। বিশেষ করে পরিবার ও সমাজকে সবার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনের পথ সুগম করতে হবে। আদর্শ ও শিক্ষামূলক বিনোদন মাধ্যমের পরিধি বাড়াতে হবে। দেশীয় সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির চর্চাকে তরুণ সমাজের যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। কেননা, সমাজ থেকে সব অনাচার দূর করে একে আদর্শ সমাজে রূপান্তর করতে মূল্যবোধের জাগরণই সহায়ক পন্থা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়