মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক
ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
নীলকান্তবাবুর সর্দি, কাশি এবং জ্বর কমেনি। সেদিন 100o ছিল, পরের দিন তিনি এই অবস্থায়ই অফিসে যাওয়ার পর আরও বেড়ে গেল। বাসায় ফোন করলে কমলা বললেন, তুমি অফিস থেকে এক্ষুণি বেরিয়ে পড় ছুটি নিয়ে, আর ডাক্তারের কাছে চলে যাও। আমি আসব?
না না, তোমার আসতে হবে না, আমি যাচ্ছি।
ফেরার পথে আনারস কিনে আনলেন। জ্বর-জ্বারি হলে আনারস খেতে ভালো লাগবে। বাসায় ফিরে বললেন, এখন একটু কম মনে হচ্ছে। ডাক্তার একটা প্যারাসিটামল খাইয়ে দিলেন। বুকের এক্সরে করতে দিলেন আর কিছু টেস্ট দিলেন। রিপোর্ট নিয়ে কাল আবার যাব।
কমলা নীলকান্তবাবুর কপালে হাত দিয়ে দেখলেন-না, তেমন একটা গরম মনে হচ্ছে না। বললেন বুকের এক্সরে কেন? শ্বাসকষ্ট ছিল?
না, তেমন না বললেন নীলকান্তবাবু।
আচ্ছা ওয়াশরুমে কাপড় ছেড়ে আসো আমি ধুয়ে দেব, গায়ে আর পানি ঢেল না আজকে। গামছা ভিজিয়ে মুছে ফেল। আমি বালতিতে পানি গরম করে একটু সেভলন দিয়ে দিচ্ছি।
ওয়াশরুম থেকে ফিরার পর সবাই এল। চন্দ্রা বলল, মামা এখন কেমন লাগছে?
ভালোই, বললেন নীলকান্তবাবু ।
কমলা আনারস নিয়ে এলেন একটা বাটিতে করে। কাটা চামচ কয়েকটা এনে দিয়ে সবাইকে বললেন, খাও।
আনারস খেতে খেতে আকাশ বলল, এক্সরের গল্প শুনব আজকে।
চন্দ্রা বলল, না না, আজকে মামার শরীর ভালো নয়, আজ থাক।
নীলকান্তবাবু বললেন, না না। আমার তো কিছুই হয়নি। জ্বর কমে গেছে। তোরা সবাই চলে আয়।
সবাই এল। আকাশ বলল, এক্সরেটা আসলে কী?
সীমা বলল, এক্সরে তো সেদিনই বুঝিয়েছিলেন বাবা। ঐ যে বর্ণালি যেদিন এসেছিল। এক্সরের তরঙ্গদৈর্ঘ্য 0.06 অ্যাংস্ট্রম থেকে 1400 অ্যাংস্ট্রম পর্যন্ত।
আকাশ বলল, তা তো বোঝলাম, আমারও মনে আছে।
নীলকান্তবাবু বুঝতে পারলেন আকাশ আরও জানতে চাচ্ছে। তিনি বললেন দ্রুতগতিসম্পন্ন ইলেকট্রন কোনও ধাতব প্রতিবন্ধক দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলে ইলেকট্রনের গতিশক্তির কিছু অংশ এক্স রশ্মিতে পরিণত হয়।
অণু বলল, এটি কীভাবে করা হয়?
তিনটি পদ্ধতিতে এক্সরশ্মি উত্পাদন করা হয়। গ্যাস নল পদ্ধতি, কুলিজ নল পদ্ধতি আর বিটাট্রন পদ্ধতি। চিকিত্সার জন্য যে যন্ত্রের সাহায্যে এই কাজটি করা হয়, তার নাম এক্সরে টিউব। এটি একটি ক্ষরণ নল। এতে ক্যাথোড ও অ্যানোড থাকে এবং এর মধ্যে 30 হাজার থেকে 50 হাজার ভোল্টের বিভব পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়।
এত্ত! চমকে উঠল বিন্দু।
হ্যাঁ, এত্ত, ক্যাথোড-অ্যানোড তো তোমরা বোঝই, নলের মধ্যে বায়ুর চাপ এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের এক ভাগ পারদ চাপের মধ্যে রাখা হয়। ক্যাথোডকে উত্তপ্ত করা হলে ইলেকট্রন নির্গত হয় এবং উচ্চ গলনাংকের ধাতু টাংস্টেন বা মলিবডেনামের দিকে মুখ করে রাখা হয়। এই ধাতুকে বলা হয় টার্গেট। নির্গত ইলেকট্রনের গতিশক্তির সামান্য অংশ 0.1%থেকে 0.2% এক্সরশ্মিতে পরিণত হয়, বাকিটা তাপে পরিণত হয়।
তাহলে তো যন্ত্রটা মারাত্মক গরম হয়ে উঠবে, বলল রেখা।
হ্যাঁ, গরম হয়ে উঠবে। এর জন্য তামার তৈরি অ্যানোড ব্যবহার করা হয় এবং এর মধ্যে ঠাণ্ডা পানির প্রবাহ দ্বারা তাপ সরিয়ে নেয়া হয়।
চন্দ্রা বলল, তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছাড়া এর বৈশিষ্ট্য আর কী কী?
নীলকান্তবাবু বললেন, এক্সরশ্মি আলোর বেগে চলে এবং সরলরেখায় চলে। এটি আধানবিহীন কণা, এর জন্য তড়িেক্ষত্র বা চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয় না। কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মিকে কঠিন এক্সরশ্মি এবং দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মিকে কোমল এক্সরশ্মি বলা হয়। কম বিভব পার্থক্য প্রয়োগ করলে কোমল এক্সরে আর বেশি বিভব পার্থক্য প্রয়োগ করলে কঠিন এক্সরে পাওয়া যায়।
তুমি যে এক্সরে করে এলে, এটি কি কঠিন, নাকি কোমল এক্সরে? বললেন কমলা।
এটি কোমল এক্সরে।
এক্সরে মানুষের শরীরে কোনও ক্ষতি করে না?
করতে পারে। এক্সরে জীবকোষকে নষ্ট করতে পারে। এইজন্য গর্ভবতী মহিলার শরীরের এক্সরে করতে গেলে ডাক্তাররা সতর্কতা অবলম্বন করেন।
কিন্তু এক্সরে কীভাবে কাজ করে? বলল সীমা।
এক্সরে মানুষের শরীরের চামড়া ও মাংস ভেদ করে চলে যেতে পারে। কিন্তু হাড় ভেদ করে যেতে পারে না। ফলে কোনও ফটোগ্রাফিক পেটের সামনে মানুষের শরীরের নির্দিষ্ট অংশ রেখে এর মধ্য দিয়ে এক্স রশ্মি যেতে দিলে যে অংশে বাধা পায়, মানে হাড়, সেই হাড়ের ছবি ফটোগ্রাফিক পেটের ওপর পড়ে। এই ছবি দেখে ডাক্তাররা বুঝতে পারেন, হাড় ফাটল, নাকি ভাঙ্গল, নাকি স্থানচ্যুত হলো।
কিন্তু তুমি যে বললে তোমার বুকের এক্সরে করতে দিয়েছে, বুকের হাড় কি ভেঙ্গেছে?
না না, বুকের হাড় ভাঙ্গেনি। আমার ফুসফুসের এক্সরে করা হয়েছে। এক্সরে ফিলমে দুইপাশে দুটো কালো অংশ দেখা যাবে, মাঝখানে সাদা অংশ। কালো অংশ হলো ফুসফুস, আর সাদা অংশ হূদপিণ্ড। এতে করে ফুসফুসের অবস্থা বোঝা যাবে।
অণু বলল, এক্সরে কি শুধু চিকিত্সায় ব্যবহূত হয়?
না না, অনেক কাজে ব্যবহূত হয়। শিল্পকারখানায় কোনও ধাতব পাতের মধ্যে ফাটল বা গর্ত খুঁজে বের করার জন্য, আসল হীরা, নকল হীরার পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য, ঝিনুকের মধ্যে মুক্তার অবস্থান নির্ণয়ের জন্য, ঢালাইয়ের কাজে কোনও খুঁত আছে কিনা, তা দেখার জন্য এক্সরে ব্যবহূত হয়। গোয়েন্দা বিভাগেও এক্সরে ব্যবহূত হয়। কাঠের বা চামড়ার বাক্সে আগ্নেয়াস্ত্র বা বিষ্ফোরক বা মাদকদ্রব্য থাকলে কিংবা দুষকৃতিকারী পেটের মধ্যে সোনা, রূপা, মুক্তা বা ইয়াবা লুকিয়ে বহন করলে এক্সরের মাধ্যমেই তা বের করা যায়। ইদানিং আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং অন্যান্য উন্নত দেশে লজেন্স, টফি, কেক, বিস্কুট ইত্যাদি মুখরুচক খাদ্যদ্রব্য তৈরির পর এক্সরের সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখা হয় অবাঞ্চিত কোনও কিছু আছে কিনা।
কিন্তু এর নাম এক্সরে কেন? বললেন কমলা। আমরা তো অংক করার সময় অজানা কোনও কিছু নির্ণয় করতে গিয়ে এক্স, ওয়াই, জেড অথবা ক, খ, ইত্যাদি ধরতাম। যেমন ধরো কোনও বস্তুর ক্রয়মূল্য এক্স, অথবা পিতার বয়স এক্স। তাহলে এই রশ্মির নাম এক্স কেন?
সবাই কমলার প্রশ্নটা সাপোর্ট করল। মজার প্রশ্ন। এটা কি অজানা কোনও রশ্মি, যে এর নাম এক্স!
নীলকান্তবাবু বললেন, এটি জানতে হলে এক্সরশ্মি আবিষ্কারের ইতিহাস জানতে হবে।
বলো।
1895 সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ইউলহেলম রন্টজেন (Wilhelm Rontgen) ক্ষরণ নল নিয়ে ক্যাথোড রশ্মির গবেষণা করার সময় দেখতে পেলেন, পাশে রাখা একটা বেরিয়াম প্যাটিনোসায়ানাইড পর্দার ওপর প্রতিপ্রভা সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রতিপ্রভা কী? বলল সীমা।
পরের অংশ আগামীকাল
